বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে নিয়োগ, বদলি এবং পদোন্নতির ক্ষেত্রে এখন থেকে রাজনৈতিক পরিচয়ের বদলে সততা, মেধা ও দক্ষতাকে চূড়ান্ত মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হবে বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার (১১ মে) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ‘পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ দেওয়ার সময় তিনি এই যুগান্তকারী ঘোষণা দেন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ‘শাপলা’ হলে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় কোনো সরকার যেমন চিরস্থায়ী রূপ পায় না, ঠিক তেমনি প্রশাসনের কোনো নির্দিষ্ট পদও কোনো ব্যক্তির জন্য চিরকাল বরাদ্দ থাকে না। পুলিশ প্রশাসনের ভেতরে থাকা প্রতিটি পদই রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই যে কর্মকর্তা যে পদে বা যে দায়িত্বেই থাকুন না কেন, প্রশাসনের সকল স্তরে কাজ করার জন্য উপযুক্ত পেশাদারিত্বের মানসিকতা থাকা একান্ত আবশ্যক।
শুধুমাত্র নিজের পদোন্নতি কিংবা পছন্দের জায়গায় পদায়নের (কর্মস্থল নির্ধারণ) প্রত্যাশা নিয়ে কাজ করলে তা বাহিনীর মূল পেশাদারিত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায় বলে মন্তব্য করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিজের পছন্দমাফিক কর্মস্থল পেলে সাময়িকভাবে হয়তো সন্তুষ্ট হওয়া সম্ভব, কিন্তু তা কখনোই একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর নীতি হতে পারে না। এই কারণে তিনি আহ্বান জানান, যার ওপর যে দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে, তাকে সেই কাজ সর্বোচ্চ নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে হবে। তবেই একটি দক্ষ, গতিশীল এবং পেশাদার পুলিশ প্রশাসন গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
সারাদেশে মাঠপর্যায়ে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের ভূমিকার কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমাজের তৃণমূল পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে পুলিশ সরাসরি ও অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে থাকে। তাদের ওপর অর্পিত এই গুরুদায়িত্ব যদি সফলভাবে ও সাহসিকতার সঙ্গে পালিত হয়, তবে একটি নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথে দেশ অনেকটাই এগিয়ে যাবে। কৌশলগত ও ইতিবাচক বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে পুলিশ যদি জনগণের মনে আস্থা ও নির্ভরতার জায়গা তৈরি করতে পারে, তবে গত ৫ আগস্টের পর দেশে যে ধরনের গণসহিংসতা (উন্মত্ত জনতার সহিংসতা) দেখা গিয়েছিল, ভবিষ্যতের যেকোনো সময়ে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি অত্যন্ত সফলভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।
গত দুই দশকের ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত দেড়-দুই বছরে দেশের পুলিশ বাহিনী এমন অনেক জটিল ও কঠিন পরিস্থিতি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সামাল দিয়েছে। বর্তমান সরকার দেশের মানুষের কাছে একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক সরকার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই সরকার পুলিশ বাহিনীকে এমন এক নতুন রূপে দেখতে চায়, যেখানে পুলিশ হবে সম্পূর্ণ জনবান্ধব এবং সাধারণ মানুষের চূড়ান্ত আস্থার প্রতীক। দেশের সাধারণ মানুষ যেন পুলিশ প্রশাসনকে সরকারের একটি স্বচ্ছ আয়না হিসেবে দেখতে পায়, সেটাই বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য। সুতরাং পুলিশ প্রশাসনের যেকোনো সাফল্য মানেই সরাসরি সরকারের সফলতা।
দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়ে সরকারের ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেন, বর্তমান সরকার দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও অপশাসনের বিরুদ্ধে বিন্দুমাত্র আপস করতে প্রস্তুত নয়। দুর্নীতি ও সন্ত্রাস দমনের ক্ষেত্রে কোনো অপরাধীর রাজনৈতিক বা দলীয় পরিচয় একেবারেই মুখ্য নয়। যে বা যারা যেকোনো ধরনের অপরাধে লিপ্ত হবে, তাদের কেবল ‘অপরাধী’ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দল কখনোই পুলিশের পরিচয় হতে পারে না; বরং পুলিশ সদস্যরা হলেন রাষ্ট্রের প্রচলিত আইনের প্রকৃত রক্ষক।
তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নয়নের ফলে বর্তমান সময়ে অপরাধের ধরনে যে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে, সে বিষয়েও পুলিশ কর্মকর্তাদের সতর্ক করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, অপরাধের বিস্তৃতি এখন আর কেবল কোনো শহর বা জেলার ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ নেই; বরং আন্তঃদেশীয় সংঘবদ্ধ অপরাধ এখন একটি রূঢ় বৈশ্বিক বাস্তবতা। এই নতুন ধারার অপরাধগুলো দমনের জন্য প্রতিটি পুলিশ কর্মকর্তাকে আরও বহুমুখী জ্ঞান ও দক্ষতায় সমৃদ্ধ হতে হবে।
পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার বিষয়েও সরকার অত্যন্ত আন্তরিক বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি উল্লেখ করেন, পুলিশের দায়িত্ব যেহেতু কোনো নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না এবং দিন-রাত এমনকি ছুটির দিনগুলোতেও তাদের নিরলস কাজ করে যেতে হয়, তাই এই বাহিনীর সদস্যদের স্বাস্থ্যগত দিকের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া জরুরি। এছাড়াও, দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে পুলিশকে তাদের উল্লেখযোগ্য সময় ব্যয় করতে হয়, যা তাদের পেশাগত দায়িত্বেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। বর্তমান সরকার দেশের প্রতিটি নাগরিকের গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণ বদ্ধপরিকর। তবে এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কেউ যেন দেশের দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে না পারে কিংবা কোনো প্রকার নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হতে না পারে, সে বিষয়ে পুলিশ বাহিনীকে সব সময় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকতে হবে।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের জনগণের উদ্দেশে সুস্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেন, বর্তমান সরকার নির্বাচনের আগে দেশবাসীর সামনে যে ইশতেহার তুলে ধরেছিল এবং ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পর যে ‘জুলাই সনদ’-এ স্বাক্ষর করেছিল, তার প্রতিটি অঙ্গীকার পর্যায়ক্রমে অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য নিঃসন্দেহে দেশের পুলিশ বাহিনীর ভেতরে কাঠামোগত সংস্কার এবং হারানো পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে আনার একটি সুস্পষ্ট ও শক্তিশালী বার্তা। দীর্ঘদিনের দলীয়করণের বিষাক্ত বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে পুলিশকে সত্যিকার অর্থে সাধারণ জনগণের সেবক হিসেবে গড়ে তোলার যে দৃঢ় আকাঙ্ক্ষা তিনি ব্যক্ত করেছেন, তা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে রাষ্ট্রের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী ও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে কেবল অপরাধী হিসেবে দেখার যে নির্দেশনা তিনি দিয়েছেন, তা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় মাইলফলক হতে পারে। তবে এখন সবচেয়ে বড় দেখার বিষয় হলো, শীর্ষ পর্যায় থেকে আসা এই কঠোর নির্দেশনার কতটা বাস্তব প্রতিফলন মাঠপর্যায়ের থানাগুলোতে ঘটে। এখন পাঠকের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন, জবাবদিহিমূলক ও পেশাদার পুলিশ বাহিনী গঠন কি আমাদের মতো দেশে খুব শিগগিরই সম্ভব? নাকি এর জন্য প্রয়োজন আরও দীর্ঘমেয়াদি ও সুগভীর কোনো সামাজিক পরিবর্তন?