পশ্চিম এশিয়ার চলমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সরবরাহ সংকটের মুখে বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে কুয়েত সরকারকে খাদ্যসামগ্রী পাঠিয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মোট ২৪০ টন খাদ্য সহায়তার প্রথম চালানটি রোববার কুয়েত সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে। সংকটের এই সময়ে এই উদ্যোগ দুই ভ্রাতৃপ্রতিম দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রোববার কুয়েতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক বিশেষ ও মর্যাদাপূর্ণ অনুষ্ঠানে এই খাদ্যসামগ্রী হস্তান্তর করা হয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত এবং পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির কুয়েতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ জারাহ জাবের আল-আহমাদ আল-সাবাহর কাছে এই খাদ্যসামগ্রীর প্রথম চালানটি বুঝিয়ে দেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন কুয়েতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল সৈয়দ তারেক হোসেন, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী রাশিদুজ্জামান মিল্লাত এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পশ্চিম এশিয়া অনুবিভাগের মহাপরিচালক। এই প্রতীকী খাদ্য সহায়তা কেবল একটি বস্তুগত উপহার নয়, বরং কুয়েতের জটিল সময়ে বাংলাদেশের জনগণের আন্তরিক সহমর্মিতার এক অনন্য নিদর্শন।
কুয়েতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই মানবিক সহায়তার পেছনের প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাণিজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী (পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী একটি সংকীর্ণ সমুদ্রপথ যা দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়) দীর্ঘকাল বন্ধ রয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধ থাকার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের আমদানিনির্ভর দেশ কুয়েতের নিয়মিত খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা তীব্র চাপের মুখে পড়েছে। কুয়েতের জাতীয় ও কৌশলগত খাদ্য মজুদ শক্তিশালী করতে এবং আকস্মিক জরুরি প্রয়োজন মেটাতে বাংলাদেশের এই সময়োপযোগী সহায়তা অত্যন্ত ফলপ্রসূ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করছে উভয় দেশের কূটনৈতিক মহল।
খাদ্যসামগ্রী হস্তান্তরের এই অনুষ্ঠানটিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে পাঠানো একটি বিশেষ চিঠি কুয়েতের আমির শেখ মেশাল আল-আহমাদ আল-জাবের আল-সাবাহর উদ্দেশ্যে হস্তান্তর করা হয়। চিঠিতে প্রধানমন্ত্রী কুয়েতের জনগণের অব্যাহত শান্তি, নিরাপত্তা, অগ্রগতি এবং সমৃদ্ধি কামনা করেন। একই সাথে তিনি দুই দেশের ঐতিহাসিক কূটনৈতিক সম্পর্কের কথা স্মরণ করে ভবিষ্যতে বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে একে অপরের পাশে থাকার এবং সহযোগিতা আরও সুদৃঢ় করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। কুয়েতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই সহমর্মিতার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
বাংলাদেশ ও কুয়েতের মধ্যকার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের এবং পরীক্ষিত। বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংকটে বাংলাদেশ কুয়েতের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এবং পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছে। কুয়েতে বর্তমানে বিপুল সংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন, যারা দেশটির অর্থনীতি বিনির্মাণে এবং বাংলাদেশের প্রবাসী আয় বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তবে এবারই প্রথম বাংলাদেশ থেকে কুয়েতের মতো একটি তেলসমৃদ্ধ ও আর্থিকভাবে শক্তিশালী দেশে সরাসরি খাদ্যসামগ্রী পাঠানোর ঘটনা ঘটল। বিশেষজ্ঞরা একে ‘খাদ্য কূটনীতি’ (কোনো দেশের সাথে রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারে খাদ্য বা কৃষিপণ্যকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা) হিসেবে অভিহিত করছেন, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সক্ষমতা ও মর্যাদাকে প্রকাশ করে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই দ্বিপাক্ষিক বিশেষ উদ্যোগের আওতায় বাংলাদেশ থেকে সর্বমোট ২৪০ টন উচ্চ মানের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যসামগ্রী কুয়েতে পাঠানো হবে। প্রথম চালানের সফল হস্তান্তরের পর পর্যায়ক্রমে বাকি চালানগুলোও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কুয়েতে পৌঁছে দেওয়া হবে। পরিবহন-ব্যবস্থাপনার নিরাপত্তা এবং গুণগত মান বজায় রেখে এই বিশাল পরিমাণ খাদ্যসামগ্রী প্রেরণের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত যত্ন সহকারে পর্যবেক্ষণ করছে বাংলাদেশ সরকারের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ সাধারণত বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটে অন্যান্য উন্নত দেশ বা আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে সাহায্য পেয়ে অভ্যস্ত। কিন্তু কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন খাতে দেশের সাম্প্রতিক অগ্রগতির ফলে বাংলাদেশ আজ নিজেই অন্য একটি বন্ধু রাষ্ট্রকে প্রয়োজনের সময়ে খাদ্য সহায়তা প্রদানে সমর্থ হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার সময়ে কুয়েতকে পাঠানো এই খাদ্য সহায়তা বাংলাদেশের দায়িত্বশীল ও সহযোগিতাপূর্ণ আচরণেরই বহিঃপ্রকাশ। এই ধরনের দূরদর্শী দ্বিপাক্ষিক কূটনীতি ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও মজবুত করতে এবং উভয় দেশের মধ্যকার বাণিজ্যিক লেনদেন বাড়াতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।