নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় গ্যাস লিকেজ থেকে ঘটা মর্মান্তিক বিস্ফোরণে দগ্ধ একই পরিবারের পাঁচ সদস্যকে পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলায় পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। স্বজনদের আর্তনাদ আর বুকফাটা কান্নায় বাউফলের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল।
শনিবার সকাল ১০টায় বাউফলের উত্তর কনকদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে নিহত চারজনের জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। এই হৃদয়বিদারক জানাজায় অংশ নেন স্থানীয় শত শত শোকাতুর মানুষ। উপস্থিত ছিলেন পটুয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. শফিকুল ইসলাম মাসুদ। জানাজা শেষে পরিবারের কর্তা মীর কালামের কবরের পাশেই তার স্ত্রী ও তিন সন্তানকে দাফন করা হয়।
ঘটনার সূত্রপাত গত রোববার নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার গিরিধারা এলাকায়। একটি ভাড়া বাসায় গ্যাস সঞ্চালন লাইনের ছিদ্র (লিকেজ) থেকে গ্যাস জমে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। এতে মীর কালামসহ তার পরিবারের পাঁচজন মারাত্মকভাবে দগ্ধ হন। প্রতিবেশীরা তাদের উদ্ধার করে ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার পরিবারের কর্তা মীর কালাম (৩৫) মৃত্যুবরণ করেন। এরপর একে একে তিন সন্তান মুন্না, কথা ও মুন্নি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। সর্বশেষ শুক্রবার সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মীর কালামের স্ত্রী সায়মা (৩২)-ও না ফেরার দেশে পাড়ি জমান।
শনিবার সকালে মরদেহগুলো গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। স্বজনদের আহাজারিতে পুরো এলাকা স্তব্ধ হয়ে যায়। নিহত মীর কালামের চাচাতো ভাই রফিক মিয়া শোকে বাকরুদ্ধ হয়ে বলেন, একটি ছোট পরিবারের এমন করুণ পরিণতি আমরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। এলাকাবাসী সম্মিলিতভাবে তাদের দাফনের সব কাজ সম্পন্ন করেছেন।
এ বিষয়ে পটুয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। খবর পাওয়ার পর থেকেই আমি তাদের চিকিৎসার খোঁজখবর নিয়েছি এবং মরদেহ পটুয়াখালীতে নিয়ে আসা ও দাফনের যাবতীয় সহযোগিতার ব্যবস্থা করেছি। একটি পরিবারের সব সদস্যকে এভাবে হারিয়ে ফেলা এক অপূরণীয় ক্ষতি।
এই মর্মান্তিক ঘটনাটি কেবল একটি পরিবারের প্রদীপ নিভিয়ে দেয়নি, বরং সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। ভাড়া বাসার গ্যাস লাইনের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে আবারও। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত তদন্ত এবং এই ধরনের ত্রুটিপূর্ণ গ্যাস লাইনগুলো মেরামতের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
একটি সাধারণ গ্যাস লাইনের ছিদ্র থেকে যে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে, তার জ্বলন্ত উদাহরণ এই ঘটনা। আমাদের আবাসিক এলাকায় গ্যাস লাইনের রক্ষণাবেক্ষণ কতটা জরুরি এবং এ বিষয়ে বাসার মালিক ও ভাড়াটিয়াদের সচেতনতা যে জীবন বাঁচাতে পারে, তা মর্মান্তিকভাবেই প্রমাণিত হলো। একই পরিবারের পাঁচজনের প্রস্থান আমাদের কেবল শোকাতুর করেনি, বরং সতর্ক হওয়ার তাগিদ দিয়ে গেল। অবকাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত আবাসিক এলাকায় গ্যাস সংযোগের বর্তমান অবস্থা নিয়মিত তদারকি করা।