দেশের বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করলেও বহুল আলোচিত চারটি বড় হত্যা মামলার তদন্তে দৃশ্যমান কোনো চূড়ান্ত অগ্রগতি মেলেনি। সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি থেকে শুরু করে মেধাবী ছাত্র ত্বকী, শিক্ষার্থী তনু কিংবা কাউন্সিলর একরামুল হক—প্রতিটি হত্যাকাণ্ডই এক একটি দীর্ঘশ্বাসের নাম। সময় গড়ালেও তদন্তের গোলকধাঁধায় আটকে থাকা এসব মামলার স্বজনরা এখন নতুন সরকারের দিকে তাকিয়ে আছেন।
তদন্তের বর্তমান চিত্র ও স্বজনদের আর্তনাদ
দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকা সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে খোদ তদন্তকারী সংস্থাই এখন চরম অনিশ্চয়তায়। ২০১২ সালে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারে নিজ বাসভবনে এই নৃশংস খুনের ঘটনা ঘটে। বর্তমান সরকারের অধীনে মামলাটি তদন্তের জন্য একটি বিশেষ টাস্কফোর্স (বিশেষ ক্ষমতা সম্পন্ন তদন্ত দল) গঠন করা হলেও এখন পর্যন্ত খুনিদের শনাক্ত করার মতো কোনো শক্তিশালী সূত্র মেলেনি। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা পিবিআইয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রহস্যভেদের মতো প্রয়োজনীয় উপাদান এখনও তাদের হাতে আসেনি। এমন পরিস্থিতিতে সাগর সরওয়ারের মা সালেহা মনির ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অন্তত সত্যটা উঠে আসবে বলে আশা করেছিলাম, কিন্তু এখন আমি সম্পূর্ণ হতাশ।"
এদিকে নারায়ণগঞ্জের মেধাবী কিশোর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যার ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার অভিযোগপত্র বা চার্জশিট (আদালতে পেশকৃত আনুষ্ঠানিক অভিযোগ) জমা পড়েনি। ২০১৩ সালে শীতলক্ষ্যা নদী থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধারের পর র্যাবের পক্ষ থেকে ১১ জনের সংশ্লিষ্টতার কথা জানানো হলেও আইনি প্রক্রিয়া আজও থমকে আছে। ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি মনে করেন, সরকার আন্তরিক হলে দ্রুত এই বিচার সম্পন্ন করা সম্ভব ছিল। র্যাব বর্তমান পর্যায়ে তদন্তের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানালেও কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে পারেনি।
তনু ও একরামুল হত্যা: ডিএনএ পরীক্ষা ও ট্রাইব্যুনালের প্রতিবেদন
কুমিল্লার শিক্ষার্থী সোহাগী জাহান তনু হত্যার ১০ বছর হতে চললেও রহস্যের জট খোলেনি। গত সেপ্টেম্বরে ষষ্ঠবারের মতো তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হয়েছে। বর্তমানে পিবিআইয়ের পরিদর্শক তরিকুল ইসলাম ডিএনএ (দেহের কোষের অনন্য বৈশিষ্ট্য) মিলিয়ে দেখার নতুন উদ্যোগ নিয়েছেন। আদালতের নির্দেশে তিন অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্যের ডিএনএ প্রোফাইল যাচাই করার কাজ শুরু হয়েছে। তনুর পরিবার মনে করে, সদিচ্ছা থাকলে এই প্রযুক্তির মাধ্যমেই খুনিদের ধরা সম্ভব।
অন্যদিকে, টেকনাফের কাউন্সিলর একরামুল হকের কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার ঘটনাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পর্যন্ত গড়িয়েছে। ২০১৮ সালে র্যাবের অভিযানে তাঁর মৃত্যুর সাত বছর পর গত ফেব্রুয়ারিতে তদন্ত সংস্থা তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এখন এটি বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে। একরামুলের স্ত্রীর দাবি, প্রধান আসামিরা বিদেশে পালিয়ে গেলেও তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত ও প্রতিকার
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাজনৈতিক প্রভাব এবং আসামিদের প্রতিপত্তিই এসব মামলার বিচার বিলম্বিত হওয়ার প্রধান কারণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, প্রভাবশালীরা তদন্ত প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করছেন। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুকের মতে, বর্তমান সরকারের উচিত মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান (আসামির মনের অবস্থা যাচাইয়ের বিশেষ পদ্ধতি) বা উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে দ্রুত তদন্ত শেষ করা।
পুলিশ সদরদপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, মামলাগুলো অত্যন্ত জটিল হওয়ায় তারা সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে এগোচ্ছেন। টেকসই অভিযোগপত্র তৈরি করাই এখন পুলিশের প্রধান অগ্রাধিকার। তবে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর প্রশ্ন—সেই 'চূড়ান্ত অগ্রাধিকার' আসলে কবে বাস্তবায়িত হবে?
বিচারের বাণী যখন নিভৃতে কাঁদে, তখন বিচারব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা টলে যায়। এই চারটি হত্যাকাণ্ড কেবল চারটি জীবনের অবসান নয়, বরং রাষ্ট্রের আইনি সক্ষমতার এক একটি পরীক্ষা। তদন্তের নামে বছরের পর বছর সময়ক্ষেপণ মূলত অপরাধীদের আড়াল করার নামান্তর। নতুন সরকারের উচিত হবে পুরনো জঞ্জাল সরিয়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা সময়বদ্ধ তদন্তের মাধ্যমে এই ক্ষতগুলোতে প্রলেপ দেওয়া। আইনের শাসন কেবল কাগজে-কলমে থাকলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা চিরকালই অনিশ্চিত থেকে যাবে।