দৈনন্দিন জীবনে একে অপরের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় ‘আল্লাহ হাফেজ’ বলার প্রচলন আমাদের সমাজে বেশ গভীরে প্রোথিত। তবে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিদায় নেওয়ার সঠিক পদ্ধতি এবং এই বাক্যের ব্যবহার নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন রয়েছে, যার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন বিশারদগণ।
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান হিসেবে মানুষের পারস্পরিক মোলাকাত বা সাক্ষাতের প্রতিটি স্তরের শিষ্টাচার নির্ধারণ করে দিয়েছে। পবিত্র ধর্মগ্রন্থ ও হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী, দুই মুসলিমের দেখা হলে অভিবাদনের মূল মাধ্যম হলো ‘সালাম’। এটি কেবল একটি লৌকিকতা নয়, বরং একে অপরের জন্য শান্তি ও নিরাপত্তার দোয়া।
হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ (সা.) পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধির অন্যতম মাধ্যম হিসেবে সালামের ব্যাপক প্রচলনের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, মুমিন হওয়ার এবং জান্নাতে যাওয়ার অন্যতম সোপান হলো পরস্পরের প্রতি ভ্রাতৃত্ববোধ, যা সালামের মাধ্যমে সুদৃঢ় হয়। শুধু ইহকালেই নয়, পরকালেও জান্নাতিরা একে অপরকে সালামের মাধ্যমেই সম্ভাষণ জানাবেন বলে পবিত্র কোরআনে উল্লেখ রয়েছে।
বিদায় নেওয়ার মুহূর্তটিতে আমাদের সমাজে ‘আল্লাহ হাফেজ’ বলার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, সে বিষয়ে ফুকাহায়ে কেরাম বা ইসলামি আইন বিশেষজ্ঞগণ বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, কারো মজলিস বা স্থান ত্যাগ করার সময়ও সালাম দিয়ে বিদায় নেওয়া সুন্নত। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত একটি হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, কোনো মজলিসে পৌঁছালে যেমন সালাম দিতে হয়, সেখান থেকে বিদায় নেওয়ার সময়ও তেমনি সালাম দেওয়া আবশ্যক। এখানে প্রথম ও দ্বিতীয়—উভয় সালামের গুরুত্বই সমান।
সুতরাং, সুন্নতের অনুসরণে বিদায় নেওয়ার প্রধান ও আদর্শ মাধ্যম হলো সালাম। সালামের বিকল্প হিসেবে ‘আল্লাহ হাফেজ’ বলা সুন্নত হিসেবে স্বীকৃত নয়। তবে এর অর্থ যেহেতু ‘আল্লাহ আপনাকে নিরাপদ রাখুন’ বা ‘আল্লাহই একমাত্র রক্ষাকারী’, তাই দোয়া হিসেবে এই বাক্যটি ব্যবহারে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। কোনো ব্যক্তি যদি সুন্নতের নিয়তে প্রথমে সালাম বিনিময় করেন এবং এরপর দোয়া হিসেবে ‘আল্লাহ হাফেজ’ বলেন, তবে তাতে কোনো ধর্মীয় বাধা বা সমস্যা নেই। অর্থাৎ, সালামের পরিপূরক দোয়া হিসেবে এটি জায়েজ বা বৈধ, কিন্তু সালামের বিকল্প বা স্থলাভিষিক্ত নয়।
পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর এই অমূল্য শিক্ষাগুলো আমাদের সামাজিক বন্ধনকে আরও মজবুত করে। বিদায়বেলায় কেবল একটি প্রথাগত শব্দ উচ্চারণ না করে, রাসুল (সা.)-এর শেখানো পদ্ধতিতে সালাম বিনিময়ের মাধ্যমে একে অপরের জন্য শান্তি কামনা করাই প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
আমাদের প্রাত্যহিক কথাবার্তায় অনেক সময় সুন্নতের চেয়ে প্রচলিত সংস্কৃতি বেশি প্রাধান্য পেয়ে যায়। ‘আল্লাহ হাফেজ’ বলাতে কোনো পাপ নেই, তবে রাসুলের (সা.) শেখানো ‘সালাম’ দিয়ে বিদায় নেওয়ার যে অনন্য সওয়াব ও বরকত রয়েছে, তা থেকে আমাদের বঞ্চিত হওয়া উচিত নয়। দোয়া ও সুন্নত—উভয়ের সঠিক স্থান ও গুরুত্ব বুঝে আমল করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।