আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে ঘরমুখো মানুষের নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক যাতায়াতের জন্য বুধবার থেকে শুরু হচ্ছে ট্রেনের আগাম টিকিট বিক্রির মূল কার্যক্রম। বিগত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এবারও টিকিট বিক্রির সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া পরিচালিত হবে ডিজিটাল মাধ্যমে। ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে নিয়মিত ট্রেনের পাশাপাশি পাঁচ জোড়া বিশেষ যাত্রীবাহী ট্রেন এবং কোরবানির পশু পরিবহনের জন্য তিনটি বিশেষ ট্রেন চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে নাড়ির টানে রাজধানী ছাড়তে শুরু করবে লাখো মানুষ। প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে চাওয়া এই বিশাল জনগোষ্ঠীর বাড়ি ফেরার অন্যতম প্রধান ভরসা হিসেবে কাজ করে ট্রেন। সাধারণ মানুষের এই ঈদযাত্রা যেন নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও ঝামেলামুক্ত হয়, সে লক্ষ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। গত ৫ মে রেলওয়ে ভবনে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের সমন্বয় সভায় ঈদযাত্রার সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা শেষে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই সিদ্ধান্তের আলোকেই মঙ্গলবার (১২ মে) রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে, বুধবার থেকে শুরু হতে যাচ্ছে ঈদযাত্রার আগাম টিকিট বিক্রির বহুল প্রতীক্ষিত কার্যক্রম।
রেলওয়ের ঘোষণা অনুযায়ী, বুধবার (১৩ মে) সকাল থেকে অন্তর্জাল বা ডিজিটাল মাধ্যমে বিক্রি শুরু হবে আগামী ২৩ মের ভ্রমণের টিকিট। এরপর ধারাবাহিকভাবে প্রতিদিন পরবর্তী দিনগুলোর টিকিট যাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, ১৪ মে বিক্রি হবে ২৪ মের টিকিট, ১৫ মে মিলবে ২৫ মের টিকিট, ১৬ মে বিক্রি হবে ২৬ মের টিকিট এবং ১৭ মে যাত্রীরা সংগ্রহ করতে পারবেন ২৭ মের অগ্রিম টিকিট। তবে ২৮, ২৯ ও ৩০ মের টিকিট বিক্রির বিষয়টি সম্পূর্ণ নির্ভর করছে পবিত্র জিলহজ মাসের চাঁদ দেখার ওপর। ঈদুল আজহা ঠিক কবে উদযাপিত হবে, তা চূড়ান্ত হওয়ার পর এই তিন দিনের টিকিট বিক্রির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
যাত্রীদের যাতায়াত আরও নির্বিঘ্ন করতে এবং টিকিটের বিপুল চাহিদা সামাল দিতে বাংলাদেশ রেলওয়ে নিয়মিত ট্রেনের পাশাপাশি এবারও বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এবারের ঈদে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পথে মোট পাঁচ জোড়া বিশেষ যাত্রীবাহী ট্রেন (যা স্পেশাল ট্রেন নামে পরিচিত) চলাচল করবে।
এর পাশাপাশি কোরবানির ঈদ হওয়ায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে পশু পরিবহনের সুবিধার্থে তিনটি 'পশু পরিবহনের বিশেষ ট্রেন' চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সাধারণত ঈদের আগে সড়কপথে ট্রাকে করে পশু আনতে গিয়ে দীর্ঘ যানজট এবং চাঁদাবাজির কারণে ব্যবসায়ীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। ট্রেনের মাধ্যমে পশু পরিবহন করা হলে একদিকে খামারি ও ব্যবসায়ীরা নিরাপদে, দ্রুত সময়ে এবং স্বল্প খরচে তাদের কোরবানির পশু মূল বাজারে আনতে পারবেন, অন্যদিকে সড়কপথেও যানজটের চাপ অনেকটা কমে আসবে।
ঈদের আনন্দ শেষে ছুটি কাটিয়ে কর্মস্থলে ফেরা মানুষের যাতায়াতও যেন সুশৃঙ্খল হয়, সেজন্য ফিরতি টিকিটের সময়সূচিও আগেভাগে জানিয়ে দিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। আগামী ২১ মে থেকে শুরু হবে ফিরতি যাত্রার আগাম টিকিট বিক্রির কার্যক্রম। ওইদিন যাত্রীরা সংগ্রহ করতে পারবেন ৩১ মের টিকিট। একইভাবে ২২ মে বিক্রি হবে ১ জুনের টিকিট, ২৩ মে মিলবে ২ জুনের টিকিট, ২৪ মে বিক্রি হবে ৩ জুনের টিকিট এবং ২৫ মে যাত্রীরা সংগ্রহ করতে পারবেন ৪ জুনের ফিরতি যাত্রার টিকিট।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, টিকিট কালোবাজারি রোধ এবং স্টেশনে যাত্রীদের দীর্ঘ লাইনের চরম ভোগান্তি এড়াতে বিগত কয়েকবারের মতো এবারও টিকিটের সম্পূর্ণ কার্যক্রম শতভাগ ডিজিটাল মাধ্যমে পরিচালিত হবে। যাত্রীরা বাংলাদেশ রেলওয়ের নির্ধারিত তথ্য বাতায়ন (ওয়েবসাইট) অথবা মুঠোফোনের বিশেষ ব্যবস্থা (অ্যাপ্লিকেশন) ব্যবহার করে খুব সহজেই নিজেদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের টিকিট কাটতে পারবেন। এর ফলে রাজধানী ঢাকার প্রধান রেলওয়ে স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার পুরোনো সেই অমানবিক কষ্ট আর যাত্রীদের পোহাতে হবে না। একসময় ঈদের টিকিট কাটতে গিয়ে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে স্টেশনের কাউন্টারের সামনেই নির্ঘুম রাত পার করতেন হাজারো মানুষ। এখন সেই কষ্টের অবসান ঘটিয়ে নিজ ঘরে বসেই কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের টিকিট পাওয়ার চমৎকার সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা একটি আধুনিক ও যাত্রীবান্ধব যোগাযোগ ব্যবস্থার ইতিবাচক দিক।
শতভাগ ডিজিটাল মাধ্যমে ট্রেনের টিকিট বিক্রির এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এর ফলে স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার অমানবিক কষ্ট থেকে সাধারণ মানুষ মুক্তি পেয়েছে। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলে, টিকিট ছাড়ার মুহূর্তেই রেলের কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডারে (সার্ভার) একসঙ্গে লাখ লাখ মানুষ প্রবেশ করায় অনেক সময় তা বিকল হয়ে যায়, যার ফলে যাত্রীরা টিকিট কাটতে গিয়ে চরম বিড়ম্বনার শিকার হন। এছাড়া ডিজিটাল জগতেও একটি অসাধু চক্র ভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে টিকিট মজুত করে কালোবাজারি করার চেষ্টা করে থাকে। তাই রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে নিজেদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি কঠোর প্রযুক্তিগত নজরদারি জোরদার করতে হবে। এর পাশাপাশি, ঈদের সময় ট্রেনের সময়সূচি বিপর্যয় যেন না ঘটে, সেদিকেও সর্বোচ্চ মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। সময়মতো ট্রেন ছাড়া এবং গন্তব্যে পৌঁছানো নিশ্চিত করা গেলেই কেবল মানুষের ঈদযাত্রা সত্যিকার অর্থে উৎসবমুখর ও স্বস্তিদায়ক হয়ে উঠবে।