বৈশ্বিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান গন্তব্য হতে চায় বাংলাদেশ। এই লক্ষ্যে নির্ভরযোগ্য, গঠনমূলক এবং স্থিতিশীল বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। শনিবার (১৩ জুন) রাজধানীর একটি হোটেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত ‘বাণিজ্য, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক কূটনৈতিক কর্মপরিকল্পনা’ শীর্ষক সম্মেলনে তিনি এই আশাবাদ ব্যক্ত করেন। প্রতিযোগিতামূলক ও নিরপেক্ষ বিনিয়োগ পরিবেশের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে বদ্ধপরিকর।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও বাংলাদেশের কৌশল
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি সংকট এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিনিয়োগ প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এমন এক জটিল প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে নীতি সংস্কার ও অর্থনৈতিক কূটনীতিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হচ্ছে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ (প্রথমত বাংলাদেশ)। এই নীতির আওতায় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলা ও অবকাঠামো উন্নয়ন
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জ্বালানি সংকটকে বিনিয়োগের অন্যতম বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই সমস্যা সমাধানে সরকার জ্বালানি নিরাপত্তা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদী সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেইন) নিশ্চিত করার ওপর কাজ করছে। দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে গতিশীল রাখতে শক্তিশালী অবকাঠামো এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ অপরিহার্য বলে তিনি মনে করেন।
অর্থনৈতিক কূটনীতি ও বহুমুখী অর্থনীতি
ড. খলিলুর রহমান আরও জানান, বৈশ্বিক ঝুঁকি মোকাবিলায় অর্থনৈতিক কূটনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কার্যকর সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। সরকার প্রথাগত খাতের বাইরে গিয়ে অর্থনীতিকে বহুমুখী করার পরিকল্পনা নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সৃজনশীল শিল্প (ক্রিয়েটিভ ইন্ডাস্ট্রি) এবং ক্রীড়া খাতের (স্পোর্টস সেক্টর) মতো উদীয়মান ক্ষেত্রগুলোতে বিনিয়োগ ও নীতিগত সহায়তা বৃদ্ধি। এই খাতগুলো ভবিষ্যৎ অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সম্মেলনের বিষয়বস্তু ও সরকারের প্রত্যাশা
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সম্মেলনে তিনটি থিমেটিক (বিষয়ভিত্তিক) অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এগুলি হলো—‘দ্য পলিসি কম্পাস’ (নীতিমালা নির্দেশনা), ‘ক্যাপিটাল ফর গ্রোথ’ (প্রবৃদ্ধির জন্য পুঁজি) এবং ‘দ্য নিউ স্টেজ: এআই, ক্রিয়েটিভ ইকোনমি অ্যান্ড স্পোর্ট’ (নতুন পর্যায়: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সৃজনশীল অর্থনীতি ও ক্রীড়া)। এসব অধিবেশনে বাণিজ্য নীতি, বিনিয়োগ প্রবাহ এবং উদ্ভাবননির্ভর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
সরকার আশা করছে, এই সম্মেলন সরকারি সংস্থা, বেসরকারি খাত এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক রূপান্তর ও টেকসই প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করবে। দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির এই নতুন যাত্রায় সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ হবে বলে দৃঢ় বিশ্বাস সরকারের।