বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে আগামী পাঁচ বছরে ৫ বিলিয়ন (৫০০ কোটি) মার্কিন ডলারের নতুন অর্থায়ন প্যাকেজ ঘোষণা করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ঢাকা অফিস সোমবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই বড় অংশীদারিত্বের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
বাংলাদেশ সফরকালে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) প্রেসিডেন্ট মাসাতো কান্ডা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের অগ্রাধিকার খাতগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এ সময় এডিবি প্রেসিডেন্ট আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশকে মোট ৫ বিলিয়ন ডলার অর্থায়নের একটি নতুন প্যাকেজ দেওয়ার ঘোষণা দেন।
বৈঠকে এডিবির প্রেসিডেন্ট মাসাতো কান্ডা বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং নতুন সংস্কারের ধাপে প্রবেশ করছে। দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, প্রবৃদ্ধির নতুন নতুন উৎস তৈরি করা এবং যেকোনো বৈশ্বিক বা অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবিলায় সক্ষম বহুমুখী ও সহনশীল অর্থনীতি গড়ে তুলতে এডিবি বাংলাদেশকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। এই নতুন অংশীদারিত্বের মাধ্যমে দেশে ব্যাপক কর্মসংস্থান ও বেসরকারি বিনিয়োগের বড় সুযোগ তৈরি হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
চলতি সফরের অংশ হিসেবে ২০২৬ সালের বার্ষিক প্রতিশ্রুতি কর্মসূচির আওতায় ইতোমধ্যে প্রায় ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের একটি ঋণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই ঋণের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের পরোক্ষ প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর সৃষ্ট চাপ মোকাবিলায় অতিরিক্ত ২৫০ মিলিয়ন ডলারের বিশেষ সহায়তা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এডিবি উল্লেখ করেছে যে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), সার এবং জাহাজ ভাড়া (শিপিং খরচ) অত্যধিক বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। একই সাথে দেশের বাজারে উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ব্যাংকিং খাতে চলমান অস্থিরতার কারণেও সামষ্টিক অর্থনীতি চাপে রয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ও অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে নিবিড়ভাবে সমন্বয় করে কাজ করবে এডিবি। পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, রপ্তানি খাতের বহুমুখীকরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে অতিরিক্ত অর্থায়ন ও বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে জোর দেওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে এডিবি প্রেসিডেন্ট ‘ইন্টিগ্রেটেড গ্রোথ নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ (সমন্বিত প্রবৃদ্ধি নেটওয়ার্ক উন্নয়ন উদ্যোগ) নামের একটি নতুন কৌশলগত প্রস্তাব পেশ করেন। এই উদ্যোগের আওতায় আগামী পাঁচ বছরে প্রতি বছর প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার করে মোট ৫ বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন করবে সংস্থাটি। এই দীর্ঘমেয়াদি প্যাকেজের মূল লক্ষ্য হচ্ছে দেশে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে সুষম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা।
মধ্যমেয়াদে বাংলাদেশের জন্য এডিবির বার্ষিক সার্বভৌম সহায়তা আরও প্রায় ২০ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে বর্তমানে চলমান বার্ষিক ২ বিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তা বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে। বাড়তি এই তহবিল বাংলাদেশের বিনিয়োগ-ভিত্তিক প্রবৃদ্ধি তরান্বিত করা, অর্থনীতির বহুমুখীকরণ, সুশাসন জোরদার এবং স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ প্রক্রিয়াকে মসৃণ ও টেকসই করতে বড় ভূমিকা রাখবে। এছাড়া বাংলাদেশের মধ্যমেয়াদি উন্নয়ন রূপরেখা প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নে সহায়তার জন্য অতিরিক্ত দুই মিলিয়ন ডলারের কারিগরি সহায়তা দেবে এডিবি।
ঢাকা সফরকালে এডিবির প্রেসিডেন্ট অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গেও একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন। বৈঠকে দেশের চলমান অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যক্রম, সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ দূরীকরণ, বৈদেশিক অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা এবং সরকারের অগ্রাধিকার খাতগুলোতে এডিবির অংশীদারিত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এছাড়া তিনি দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গেও মতবিনিময় করেন। ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে দেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা, বিদ্যমান আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ, পুঁজিবাজারের আধুনিকায়ন এবং যৌথ অর্থায়নের মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিধি বাড়ানোর বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়।
বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য এডিবির এই বড় অংকের অর্থায়ন প্যাকেজ অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। বিশেষ করে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের এই ক্রান্তিকালে এই সহায়তা দেশের অর্থনীতিকে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। তবে বৈদেশিক ঋণের সুষ্ঠু ব্যবহার, সুশাসন নিশ্চিতকরণ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বৃদ্ধি করাই হবে মূল চ্যালেঞ্জ। এই ঋণের কার্যকর ব্যবহার যদি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উৎপাদনশীল খাতের টেকসই উন্নয়নে করা যায়, তবেই বাংলাদেশ কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক অগ্রগতির মাইলফলক স্পর্শ করতে সক্ষম হবে