দেশের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘শিশু স্বর্গ’ নামে একটি যুগান্তকারী প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। সমাজের মূল ধারায় এই শিশুদের সম্পৃক্ত করতে এবং তাদের অধিকার ও সুরক্ষা সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রাথমিকভাবে দেশের ১০টি জেলার ১০টি উপজেলায় এই বিশেষায়িত সেবা কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ সরকারের এক উচ্চপর্যায়ের সভায় দেশের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের সার্বিক উন্নয়নে ‘শিশু স্বর্গ’ প্রকল্প চালুর এই নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। গত বুধবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার রক্ষা, নিরাপত্তা ও সেবা নিশ্চিতকরণ সংক্রান্ত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকে শিশুদের জন্য বিশেষায়িত এই সেবা কেন্দ্রের কাঠামো এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। সভার পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রীর জনসংযোগ শাখা থেকে এই উদ্যোগের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়েছে।
সরকারের এই নতুন পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো—শারীরিক বা মানসিকভাবে পিছিয়ে পড়া শিশুদের জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলা। প্রকল্পের প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের ১০টি জেলার নির্বাচিত ১০টি উপজেলায় এই কার্যক্রম শুরু করা হবে। যদি এই পরীক্ষামূলক প্রকল্প সফল হয়, তবে পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি উপজেলাতেই ‘শিশু স্বর্গ’ কেন্দ্র স্থাপন করার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এই কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের ফিজিওথেরাপি (শারীরিক কসরতভিত্তিক চিকিৎসা), পেশাগত থেরাপি এবং মানসিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় সকল সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হবে।
সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয়কে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের অধিকার সুরক্ষায় কঠোর হওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, “আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তরে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের মর্যাদা ও সক্ষমতাকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। তারা যেন কোনোভাবেই নিজেদের বোঝা মনে না করেন, বরং রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিটি কাজে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারেন, সেই পরিবেশ তৈরি করা আমাদের নৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।”
অবকাঠামোগত পরিবর্তনের ওপর বিশেষ জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে আরও বলেন, দেশের সকল সরকারি ও বেসরকারি ভবন নির্মাণ নীতিমালায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা জরুরি। বিশেষ করে হাসপাতাল, রেস্তোরাঁ ও সরকারি দপ্তরসহ সকল জনসমাগমপূর্ণ স্থানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চলাচলের জন্য বিশেষ ঢালু পথ বা র্যাম্প নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া তাদের ব্যবহারের উপযোগী বিশেষ শৌচাগার ব্যবস্থা রাখাও বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দেন যে, ভবনের কক্ষের দরজাগুলো এমনভাবে প্রশস্ত করতে হবে যাতে চাকাযুক্ত বিশেষ চেয়ার (হুইলচেয়ার) ব্যবহারকারীরা সহজেই কোনো বাধা ছাড়াই যাতায়াত করতে পারেন।
পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন নিয়েও সভায় গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী জানান, অদূর ভবিষ্যতে নারীদের জন্য যে বিশেষ বিদ্যুৎচালিত বড় যাত্রীবাহী যান (ইলেক্ট্রিক বাস) চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে, সেগুলোতে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য নির্ধারিত আসন ও যাতায়াত সুবিধা থাকতে হবে। গণপরিবহনে তাদের এই বিশেষ অধিকার নিশ্চিত করা গেলে তাদের যাতায়াত সমস্যা অনেকটাই লাঘব হবে।
দেশের সচেতনতা বৃদ্ধিতে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়কে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের প্রতিভা বিকাশ এবং তাদের সমস্যাগুলো সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরতে নিয়মিত টেলিভিশন অনুষ্ঠান ও প্রচারণা চালানোর নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়গুলো সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত তদারকি করার জন্যও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য ‘নতুন কুঁড়ি ক্রীড়া’ প্রতিযোগিতার মতো জাতীয় পর্যায়ে আয়োজিত ইভেন্টগুলোতেও এই শিশুদের অংশগ্রহণের সুযোগ অবারিত রাখার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে সরকারের উচ্চপদস্থ মন্ত্রী ও কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন স্থানীয় সরকার ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত, তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসির খান চৌধুরী, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার এবং বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতির প্রতিষ্ঠাতা আবদুস সাত্তার দুলালসহ বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ তাদের গুরুত্বপূর্ণ মতামত তুলে ধরেন।
‘শিশু স্বর্গ’ প্রকল্পের এই উদ্যোগটি বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং মানবিক। দীর্ঘদিন ধরে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরা আমাদের সমাজে অবহেলিত ছিল। কিন্তু সরকারের এই সমন্বিত পদক্ষেপ—যা স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অবকাঠামো এবং পরিবহনকে একসাথে স্পর্শ করেছে—তা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে এই শিশুরা দেশের সম্পদে পরিণত হবে। তবে প্রকল্পের সাফল্য কেবল ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; বরং মাঠ পর্যায়ে ১০টি উপজেলায় এই সেবাগুলো কত দ্রুত ও স্বচ্ছতার সাথে পৌঁছাচ্ছে, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। একটি মানবিক রাষ্ট্র গঠনে এই শিশুদের অধিকার রক্ষা করা আমাদের সকলের সম্মিলিত দায়িত্ব।