আসন্ন ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক করতে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে। তবে সম্ভাব্য বৃষ্টির কারণে এবারের ঈদযাত্রা বেশ কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী। মহাসড়কে যানজট ও যাত্রীদের আকস্মিক চাপ এড়াতে এবার দেশের পোশাক কারখানাগুলোতে ধাপে ধাপে ছুটি দেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছে।
প্রতি বছরই ঈদের ছুটিতে নাড়ির টানে শেকড়ে ফেরা সাধারণ মানুষের জন্য একটি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায় সড়ক-মহাসড়কগুলোর যানজট। এবারও তার ব্যতিক্রম হওয়ার সম্ভাবনা কম। সোমবার (১১ মে) সচিবালয়ে ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সামনে এই পরিস্থিতি তুলে ধরেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি জানান, যাতায়াতের পথে মানুষের ভোগান্তি কমাতে সব মন্ত্রণালয় নিজেদের সর্বোচ্চ সক্ষমতা নিয়ে মাঠে কাজ করছে।
ঈদের সময় সবচেয়ে বড় চাপটি আসে মূলত দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাতের কর্মীদের কাছ থেকে। একসঙ্গে লাখ লাখ শ্রমিক রাস্তায় নামলে পরিবহন ব্যবস্থায় যে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, তা সামাল দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই প্রবল সংকট এড়াতে এবার পোশাক কারখানার শ্রমিকদের ছুটির বিষয়টিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেতুমন্ত্রী জানান, তিন থেকে চার দিনের মধ্যে ধাপে ধাপে বিভিন্ন এলাকার কারখানাগুলোতে ছুটি ঘোষণার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পোশাক কারখানা মালিকদের শীর্ষ সংগঠনগুলো সরকারের এই প্রস্তাবে এরই মধ্যে নিজেদের সম্মতি জ্ঞাপন করেছে।
অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে মন্ত্রী বলেন, গতবার বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সঙ্গে আলোচনা করে তিন ধাপে ছুটি দেওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে শেষ মুহূর্তে রাস্তায় মানুষের উপচে পড়া ভিড় তৈরি হয়। শুধুমাত্র ওই একদিনেই গাজীপুর শিল্পাঞ্চল এবং এর আশপাশের এলাকাগুলো থেকে প্রায় ১০ থেকে ১৫ লাখ মানুষ একসঙ্গে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেয়। এতো বিপুল সংখ্যক মানুষের চাপ সামাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত পরিবহন ব্যবস্থা না থাকায় চরম অরাজকতার সৃষ্টি হয়েছিল।
ছুটির পরপরই দ্রুত বাড়ি ফেরার যে প্রবল তাগিদ, সেটিও বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। সাধারণ যাত্রীরা নির্দিষ্ট বাসস্ট্যান্ড থেকে টিকিট কেটে নিয়ম মেনে বাসে ওঠার কোনো তোয়াক্কা করেন না। তারা মরিয়া হয়ে রাস্তায় নেমে পড়েন এবং যাত্রীবাহী বাস, মালবাহী বড় গাড়ি (ট্রাক) বা ছোট মালবাহী গাড়ি—যাই পান, তাতেই উঠে পড়েন। এসব যানবাহনের যান্ত্রিক সুস্থতা বা চলাচলের উপযোগিতা আছে কি না, সেদিকেও তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ থাকে না। মন্ত্রীর মতে, যাত্রীদের এই তাড়াহুড়োর কারণে একদিকে যেমন ভয়াবহ যানজটের সৃষ্টি হয়, অন্যদিকে মারাত্মক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যায়। এই অনাকাঙ্ক্ষিত সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একশ্রেণির অসাধু পরিবহন মালিক ও শ্রমিক অতিরিক্ত ভাড়াও আদায় করে থাকে। এই পরিস্থিতি কঠোর হাতে দমন করতে এবার সারা দেশে ৬৯টি ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে সার্বক্ষণিক কাজ করবে বলে জানানো হয়েছে।
এবারের ঈদযাত্রার অন্যতম বড় বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে প্রতিকূল আবহাওয়াকে। সেতুমন্ত্রী গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী যদি বৃষ্টির কবলে পড়তে হয়, তবে মহাসড়কে যানজট চরম আকার ধারণ করতে পারে। বৃষ্টির সময় রাস্তায় পর্যাপ্ত সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রাখাও বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। গতবারের একদিনের কালবৈশাখী ঝড় ও বৃষ্টিতেই বড় ধরনের ভোগান্তি পোহাতে হয়েছিল ঘরমুখো যাত্রীদের। এর পাশাপাশি কোরবানির পশুবাহী গাড়ির বাড়তি চাপ থাকায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া এবার আরও বেশি কঠিন হতে পারে।
অতিরিক্ত ভাড়ার বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে শেখ রবিউল আলম জানান, ইতোমধ্যে সরকার বাস ভাড়া সমন্বয় করেছে এবং নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। তবে বাসস্ট্যান্ডের বাইরে মাঝরাস্তা থেকে যারা গাড়িতে ওঠেন, তাদের ভাড়া তদারকি করা দায়িত্বপ্রাপ্তদের জন্য বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। তারপরও পুরো যাত্রাপথে শৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারের তরফ থেকে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করা হবে।
এছাড়া নৌপথ ও ফেরি পারাপারের ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা এড়াতে নতুন কিছু কঠোর নিয়ম আরোপ করা হয়েছে। বড় লঞ্চ বা ফেরিতে ওঠার ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে, ফেরিতে বাস ওঠার আগে সব যাত্রীকে নামিয়ে দেওয়া হবে এবং নির্দিষ্ট প্রতিবন্ধক পার হয়ে যাত্রীদের আলাদাভাবে পায়ে হেঁটে ফেরিতে উঠতে হবে। পাশাপাশি ঢাকার সদরঘাটে ছোট নৌকা বা দ্রুতগতির জলযান থেকে মাঝনদীতে কোনোভাবেই চলন্ত লঞ্চে ওঠা যাবে না। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই ধরনের কাজ করলে তাৎক্ষণিক আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রতি বছরই ঈদের সময় সাধারণ মানুষের বাড়ি ফেরা এক চরম দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সরকারের নানামুখী উদ্যোগ ও পরিকল্পনা থাকলেও জনগণের অসচেতনতা এবং নিয়ম না মানার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। শুধু আইন প্রয়োগ বা ভ্রাম্যমাণ আদালত দিয়ে এই চিরচেনা সংকট পুরোপুরি নিরসন সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন পরিবহন মালিক, শ্রমিক এবং সাধারণ যাত্রীদের সম্মিলিত ও স্বতঃস্ফূর্ত সচেতনতা। 'জীবনের চেয়ে বাড়ি ফেরা বড় নয়'—এই সাধারণ বোধটুকু জাগ্রত না হলে নিরাপদ ঈদযাত্রা কেবল কাগুজে প্রতিশ্রুতি হয়েই থেকে যাবে। এখন পাঠকের কাছে বড় একটি প্রশ্ন হলো— আমরা কি এবার একটি সুশৃঙ্খল ঈদযাত্রা দেখতে পাব, নাকি আবারও সেই পুরনো বিশৃঙ্খলার বলি হয়ে প্রিয়জনের কাছে ফেরার আনন্দ দীর্ঘশ্বাসে রূপ নেবে?