রাজধানীর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা ও গভীর ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পবিত্র ঈদুল আজহার প্রথম জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল সাতটায় অনুষ্ঠিত এই জামাতে হাজারো ধর্মপ্রাণ মুসলমান অংশ নিয়ে দেশ, জাতি ও সমগ্র বিশ্বমানবতার কল্যাণ কামনায় মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করেন। মেঘলা আকাশ উপেক্ষা করে ভোর থেকেই মুসল্লিদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো মসজিদ প্রাঙ্গণ।
ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ উপলক্ষে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের বিশাল ঢল নেমেছে। দীর্ঘ এক বছর পর আবারও ফিরে এসেছে আত্মত্যাগের এই মহান উৎসব। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের আশায় পশু কোরবানির আগে ঈদের দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায় করতে বৃহস্পতিবার ভোর থেকেই রাজধানীর নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন হাজারো মানুষ। নতুন পোশাক গায়ে জড়িয়ে শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ—সব বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে এক অভাবনীয় ও উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয় মসজিদ এলাকায়। বাবার হাত ধরে আসা ছোট শিশুদের চোখেমুখে ছিল বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস, আবার বয়সের ভারে ন্যুব্জ অনেক প্রবীণকেও লাঠিতে ভর করে মসজিদে আসতে দেখা যায়।
সকাল সাতটায় জাতীয় মসজিদে ঈদের প্রথম জামাত (সম্মিলিত নামাজ) অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইমামতি করেন বায়তুল মোকাররমের পেশ ইমাম হাফেজ মাওলানা মুফতি মো. মিযানুর রহমান। ঈদের এই প্রধান জামাতে অংশ নিতে ফজরের নামাজের পর থেকেই দলে দলে মানুষ আসতে শুরু করেন। মুসল্লিদের উপচে পড়া ভিড়ের কারণে সকাল পৌনে সাতটার মধ্যেই মসজিদের মূল ভবন থেকে শুরু করে বাইরের খোলা প্রাঙ্গণ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। ভেতরে জায়গা না পেয়ে অনেককে মসজিদের সিঁড়ি ও বাইরের রাস্তায় জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ আদায় করতে দেখা যায়।
ঈদের দুই রাকাত নামাজ শেষে খুতবা (ইসলামি বয়ান বা ভাষণ) পাঠ করা হয়। এরপর অনুষ্ঠিত হয় আবেগঘন মোনাজাত। মোনাজাতে দুই হাত তুলে মহান আল্লাহর দরবারে কান্নায় ভেঙে পড়েন হাজারো মুসল্লি। এ সময় সমগ্র মুসলিম উম্মাহর (বিশ্ব মুসলিম সম্প্রদায়) শান্তি, দেশের সার্বিক অগ্রগতি এবং জাতির মঙ্গল কামনায় বিশেষ প্রার্থনা করা হয়। মোনাজাত শেষে চিরায়ত ঐতিহ্য অনুযায়ী মুসল্লিরা একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করেন এবং হাসিমুখে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। পরিচিত-অপরিচিত নির্বিশেষে ধনী ও গরিবের ভেদাভেদ ভুলে একই কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় এবং কোলাকুলি করার এই দৃশ্য সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
প্রতি বছরের মতো এবারও বিপুলসংখ্যক মুসল্লির সুবিধার্থে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে মোট পাঁচটি ঈদ জামাতের ব্যবস্থা করেছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন (ইসলামি বিষয়াবলি নিয়ে কাজ করা সরকারি প্রতিষ্ঠান)। প্রথম জামাতের পর সকাল আটটায় অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় জামাত। এতে ইমামতি করেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালক মাওলানা ওয়ালীয়ূর রহমান খান। এরপর সকাল নয়টায় তৃতীয় জামাতে ফাউন্ডেশনের মুফতি মো. আবদুল্লাহ এবং সকাল ১০টায় চতুর্থ জামাতে উপ-পরিচালক মাওলানা মোহাম্মদ নূর উদ্দীন ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সবশেষে সকাল পৌনে ১১টায় পঞ্চম ও চূড়ান্ত জামাত অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ইমামতি করেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ধর্মীয় প্রশিক্ষক জুবাইর আহাম্মদ আল-আযহারী। পর্যায়ক্রমে অনুষ্ঠিত প্রতিটি জামাতেই মুসল্লিদের বিপুল উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
দেশের অন্যতম প্রধান এই ঈদ জামাতকে কেন্দ্র করে বায়তুল মোকাররম ও এর আশপাশের এলাকায় ব্যাপক ও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় দেখা যায়। ঈদগাহে প্রবেশের আগে প্রতিটি ফটকে ধাতব বস্তু শনাক্তকরণ যন্ত্র দিয়ে মুসল্লিদের নিবিড় তল্লাশি করে ভেতরে ঢোকানো হয়। পুলিশ ও সাদা পোশাকের গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা পুরো এলাকা কড়া নজরদারিতে রাখেন। মসজিদের চারপাশের রাস্তাগুলোতে সাধারণ যান চলাচল সীমিত করে দেওয়া হয়, যাতে মুসল্লিরা নিরাপদে ও শান্তিতে হেঁটে যাতায়াত করতে পারেন।
অন্যদিকে, ঈদের সকালে আবহাওয়া কেমন থাকবে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে আগে থেকেই কিছুটা শঙ্কা ছিল। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কোরবানির ঈদের সকালে দেশের কোথাও কোথাও বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকার আকাশ বেশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলেও শেষ পর্যন্ত কোনো বৃষ্টি হয়নি। ভোরের দিকে হালকা হিমেল হাওয়া ও মেঘলা আকাশ এক স্নিগ্ধ পরিবেশের সৃষ্টি করে। তীব্র গরম বা রোদের খরতাপ না থাকায় সাধারণ মানুষ বেশ শান্তিতেই নামাজ শেষ করে পশু কোরবানির প্রস্তুতির জন্য হাসিমুখে বাড়ি ফিরে যান।
জাতীয় মসজিদে হাজারো মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং একে অপরের প্রতি সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ আমাদের সমাজের মূল শক্তির জায়গাটি স্মরণ করিয়ে দেয়। কোরবানি শুধু পশু জবাইয়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি আত্মত্যাগ ও আত্মশুদ্ধির এক মহান শিক্ষা। ধনী-নির্ধনের ভেদাভেদ ভুলে ঈদের ময়দানে যে সাম্য ও ঐক্যের ছবি আমরা দেখি, তা যদি সারা বছর আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রকাঠামোতে ধরে রাখা যায়, তবে একটি সুখী ও বৈষম্যহীন দেশ গঠন সময়ের ব্যাপার মাত্র। মনের ভেতরের পশুকে কোরবানি করে মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করাই হোক এবারের ঈদের সবচেয়ে বড় অর্জন।