Logo
ট্রেন্ডিং: হামে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত সহস্রাধিক যুবলীগ চেয়ারম্যান পরশ ও স্ত্রীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশ আর কখনও কারও কাছে মাথা নত করবে না: সংসদে খলিলুর নেপাল সীমান্তে প্রলয়ঙ্করী বন্যা: নিহত ৩৩০, নিখোঁজ সহস্রাধিক

ভরা মৌসুমেও উল্টো চিত্র: চার সংকটে উত্তপ্ত দিনাজপুরের চালের বাজার, বস্তাপ্রতি বেড়েছে ৩০০ টাকা পর্যন্ত

Roksana
29 August 2026, 02:06 AM পড়তে ১ মিনিট
ভরা মৌসুমেও উল্টো চিত্র: চার সংকটে উত্তপ্ত দিনাজপুরের চালের বাজার, বস্তাপ্রতি বেড়েছে ৩০০ টাকা পর্যন্ত

ইরি-বোরো ধানের ভরা মৌসুমে যেখানে চালের বাজারে ক্রেতাদের স্বস্তি পাওয়ার কথা, সেখানে দেশের অন্যতম প্রধান শস্যভাণ্ডার দিনাজপুরে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। ঈদের পর মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রকারভেদে ৫০ কেজির প্রতি বস্তা চালের দাম বেড়েছে ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত। বিদ্যুৎ বিভ্রাট, জ্বালানি তেল ও ধানের বাড়তি দামের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা, যা সাধারণ ভোক্তাদের কপালে নতুন করে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।


কৃষিপ্রধান উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে বড় চালের মোকাম দিনাজপুরে বোরো মৌসুমের এই সময়ে বাজার সাধারণত নিম্নমুখী থাকে। তবে এবার উৎসবের ছুটির পর বাজার খোলার পরপরই চালের দাম আকস্মিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সপ্তাহ খানেক আগেও বাজারে যে মিনিকেট চালের ৫০ কেজির বস্তা বিক্রি হতো ৩ হাজার ১০০ টাকায়, তা এখন কিনতে হচ্ছে ৩ হাজার ৩০০ টাকায়। মধ্যবিত্তের পছন্দের আঠাশ জাতের চালের বস্তা ২ হাজার ৭০০ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮৫০ টাকায়। এছাড়া উনত্রিশ জাতের চালের বস্তা ২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে ২ হাজার ৬০০ টাকা এবং সুমন স্বর্ণা চালের বস্তা ২ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। উৎসব-পার্বণে ব্যবহৃত চিনিগুড়া সুগন্ধি চালের দামেও বড় ধরনের লাফ দেখা গেছে; ৭ হাজার টাকার বস্তা এখন বিক্রি হচ্ছে ৭ হাজার ৪০০ টাকায়।

ব্যবসায়ী ও মিল মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই অপ্রত্যাশিত মূল্যবৃদ্ধির নেপথ্যে রয়েছে প্রধানত চারটি কারণ। এগুলো হলো— বাজারে ধানের সরবরাহ সংকট ও দাম বৃদ্ধি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়া এবং সাম্প্রতিক সময়ে তীব্র ও ঘনঘন লোডশেডিং (বিদ্যুৎ সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ থাকা)। এই চার সংকটের কারণে চালের উৎপাদন ও পরিবহন খরচ অনেক বেড়ে গেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে।

দিনাজপুরের বাহাদুরবাজারের চাল ব্যবসায়ী আলাল উদ্দিন ব্যাপারী জানান, দীর্ঘ বছরের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী এই সময়ে চালের দাম কমার কথা। কিন্তু এবার ধানের দাম ও উৎপাদন খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় বাজার দর উল্টো দিকে হাঁটছে। আরেক ব্যবসায়ী আশরাফ আলী ছুটু জানান, চালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে খুচরা বিক্রেতারা বাড়তি কোনো মুনাফা করতে পারছেন না। মিলগেট থেকেই বেশি দামে চাল কিনতে হচ্ছে, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাড়তি পরিবহন ভাড়া। ফলে বাজারে দাম বাড়ানো ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় ছিল না।

মূল্যবৃদ্ধির এই প্রভাব পড়েছে বেচাবিক্রিতেও। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, অতিরিক্ত দামের কারণে সাধারণ মানুষ অত্যন্ত সীমিত পরিসরে কেনাকাটা করছেন। বাহাদুরবাজারের খুচরা চাল বিক্রেতা ফিরোজ বলেন, আগে যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৫০ বস্তা চাল বিক্রি হতো, বাজারে মন্দাভাবের কারণে এখন তা নেমে এসেছে মাত্র পাঁচ বস্তায়। মানুষ এখন অত্যন্ত জরুরি প্রয়োজন ছাড়া চাল কিনছে না।

দিনাজপুর জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় দুই হাজার চালকল রয়েছে, যার মধ্যে স্বয়ংক্রিয় চালকল বা অটোরাইস মিলের সংখ্যা প্রায় ৩০০টি। সাধারণ সময়ে এই মিলগুলো থেকে দৈনিক ৭ থেকে ৮ হাজার মেট্রিক টন চাল উৎপাদিত হয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হতো। তবে বর্তমানে এই উৎপাদনের পরিমাণ নেমে এসেছে অর্ধেক অর্থাৎ মাত্র ৩ থেকে ৪ হাজার মেট্রিক টনে। মিল মালিকদের মতে, একটি স্বয়ংক্রিয় চালকলের মোট পরিচালন ব্যয়ের প্রায় ১৫ শতাংশই খরচ হয় বিদ্যুৎ খাতে। কিন্তু তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে মিলের কার্যক্রম দফায় দফায় ব্যাহত হচ্ছে। অনেক সময় হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিচ্ছে, যা মেরামত করতে বাড়তি অর্থ ব্যয় হচ্ছে।

বাংলাদেশ অটো, মেজর ও হাস্কিং মিল মালিক সমিতির সহ-সভাপতি সহিদুর রহমান পাটোয়ারী মোহন এই বিষয়ে বলেন, ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে মিলগুলোর উৎপাদন ব্যয় প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ওপর সম্প্রতি বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় সামগ্রিক খরচ আরও বেড়ে গেছে। ধানের ঊর্ধ্বমুখী বাজার এবং বিদ্যুতের লোডশেডিং এই দুই সংকটের কারণে মিলারদের উৎপাদন ক্ষমতা সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

দিনাজপুর চাল ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি আজগার আলী বলেন, ধান, জ্বালানি ও বিদ্যুতের বাড়তি দামের কারণে উৎপাদন পর্যায়ে যে অসঙ্গতি তৈরি হয়েছে, তা খুচরা বাজার পর্যন্ত চলে এসেছে। দেশের প্রধান এই মোকামে চালের দাম বাড়তে থাকলে দেশের অন্যান্য জেলাগুলোতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।

অন্যদিকে, নিত্যপ্রয়োজনীয় এই খাদ্যপণ্যের লাগামহীন দাম বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন দিনমজুর ও নিম্ন আয়ের মানুষ। বাজারে আসা ক্রেতা আমীর হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মানুষের আয় না বাড়লেও চাল থেকে শুরু করে সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম আকাশছোঁয়া। বোরো মৌসুমে যদি ভাতের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়, তবে দিনশেষে আমাদের টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়বে।


প্রধান ফসল ঘরে তোলার ভরা মৌসুমে চালের বাজারে এমন ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য একটি সতর্কবার্তা। সাধারণত এই সময়ে সরকারি সঠিক তদারকি এবং মজুতদারদের ওপর নজরদারি থাকলে বাজার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব। কিন্তু এবার লোডশেডিং ও জ্বালানি সংকটের মতো কাঠামোগত সমস্যা উৎপাদন ব্যয়কে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যা খুচরা বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। ধানের বড় অংশ মজুতকারীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার যে অভিযোগ উঠেছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের কঠোর আইনি পদক্ষেপ ও নজরদারি এখনই জোরদার করা না হলে, অদূর ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষের খাদ্য কষ্ট আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে।

পরবর্তী খবর লোড হচ্ছে...
জাতীয়

ভরা মৌসুমেও উল্টো চিত্র: চার সংকটে উত্তপ্ত দিনাজপুরের চালের বাজার, বস্তাপ্রতি বেড়েছে ৩০০ টাকা পর্যন্ত

R
Roksana | 06 June 2026
বিস্তারিত পড়ুন
new.karatoa.com.bd

Logo

প্রচ্ছদ
সোশ্যাল মিডিয়া ই-পেপার