মেহেরপুরে বাবার জন্য মাঠে খাবার নিয়ে যাওয়ার পথে নয় বছরের এক অবুঝ শিশুকে ধর্ষণের দায়ে এক যুবককে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। দেশের বিচারিক ইতিহাসে এক অভাবনীয় নজির স্থাপন করে মাত্র ২৯ কার্যদিবসের মধ্যে এই চাঞ্চল্যকর মামলার রায় ঘোষণা করা হলো, যা সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিপরীতে একটি শক্তিশালী ও আশাব্যঞ্জক বার্তা দিচ্ছে।
রোববার (২৪ মে) দুপুরে মেহেরপুর শিশু সহিংসতা দমন আদালতের বিচারক মো. তাজুল ইসলাম জনাকীর্ণ আদালত কক্ষে এই যুগান্তকারী রায় ঘোষণা করেন। কাঠগড়ায় দাঁড়ানো আসামির উপস্থিতিতে এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির নাম শাকিল হোসেন। সে মেহেরপুর জেলার গাংনী উপজেলার চাঁদপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দাল হাসানের ছেলে। আদালত জঘন্য এই অপরাধের জন্য আসামিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আদেশের পাশাপাশি তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড দিয়েছেন। রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, এই জরিমানার টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হলে আসামিকে আরও এক বছর সশ্রম কারাভোগ করতে হবে। এছাড়া, বিচারক তার আদেশে স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, ধর্ষকের স্থাবর ও অস্থাবর যাবতীয় সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে সেই প্রাপ্ত অর্থ আদালতের মাধ্যমে ভুক্তভোগী (নির্যাতনের শিকার) শিশুটির পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে বুঝিয়ে দিতে হবে।
মামলার বিবরণে জানা যায়, গত ১৬ জুন এক হৃদয়বিদারক ঘটনার শিকার হয় পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া ওই শিশুটি। গ্রামবাংলার চিরায়ত রূপ অনুযায়ী, প্রতিদিনের মতো সেদিনও শিশুটি তার কৃষিজীবী বাবার জন্য দুপুরের খাবার নিয়ে বাড়ির পাশের ফসলের মাঠে যাচ্ছিল। পথে নির্জন স্থানে আগে থেকেই ওত পেতে ছিল পাষণ্ড শাকিল হোসেন। শিশুটিকে একা পেয়ে সে পথরোধ করে এবং হাতে থাকা ধারালো গ্রামীণ অস্ত্র (হাঁসুয়া) দিয়ে গলা কেটে হত্যার ভয় দেখায়। পরে অবুঝ ও ভীতসন্ত্রস্ত শিশুটিকে জোরপূর্বক টেনেহিঁচড়ে রাস্তার পাশের একটি পাটক্ষেতে নিয়ে গিয়ে তার ওপর পৈশাচিক নির্যাতন চালায় ওই ঘাতক।
নির্মম এই ঘটনার পর রক্তাক্ত ও মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত শিশুটি কোনোমতে বাড়িতে ফিরে আসে। পরে সে কান্নাজড়িত কণ্ঠে পরিবারের কাছে ওই যুবকের পাশবিকতার কথা খুলে বলে। এমন জঘন্য ঘটনার খবর মুহূর্তের মধ্যে পুরো গ্রামে ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভের দাবানল জ্বলে ওঠে। বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসী একজোট হয়ে দ্রুত ওই পাষণ্ডকে খুঁজে বের করে এবং তাকে ধরে উত্তমমাধ্যম দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হাতে তুলে দেয়। এই ঘটনায় চরম নিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষোভে ফেটে পড়া শিশুটির বাবা বাদী হয়ে গাংনী থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন।
এই মামলার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও প্রশংসনীয় দিক হলো এর বিচারপ্রক্রিয়ার অভাবনীয় গতি। মেহেরপুর শিশু সহিংসতা দমন বিশেষ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের নিযুক্ত আইনজীবী মোস্তাফিজুর রহমান তুহিন এই রায়ের সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, এটি দেশের বিচার বিভাগের জন্য নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। দীর্ঘসূত্রিতা ও বছরের পর বছর মামলার পেছনে ঘুরে সর্বস্বান্ত হওয়ার যে প্রচলিত ধারণা মানুষের মনে গেঁথে আছে, এই রায় তাকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করেছে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মাত্র ২৯ কার্যদিবসের মধ্যে এই বিচারকাজ সম্পন্ন হয়েছে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে সরাসরি উপস্থিতি এবং দূরনিয়ন্ত্রিত দৃশ্যমান যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে সাক্ষীদের জবানবন্দি ও জেরা গ্রহণ করা হয়েছে। রায় ঘোষণার সময় আদালতে মামলার বাদী, আসামিপক্ষের আইনজীবী এবং দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শাকিল হোসেন উপস্থিত ছিল।
একটি অবুঝ শিশুর ওপর এমন বর্বর নির্যাতন আমাদের সামাজিক অবক্ষয়ের এক চূড়ান্ত ও বীভৎস রূপকে উন্মোচিত করে। তবে মাত্র ২৯ দিনে তথ্যপ্রযুক্তির নিপুণ ব্যবহারে এই মামলার যে দ্রুত বিচার সম্পন্ন হলো, তা দেশের সামগ্রিক বিচারব্যবস্থার জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। অপরাধ করে পার পাওয়ার যে দীর্ঘদিনের অপসংস্কৃতি সমাজে প্রচলিত, এই রায় তার মূলে কুঠারাঘাত করেছে। বিচারহীনতার ভয়াল অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে এমন দ্রুতগতিতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা গেলে সমাজ থেকে এ ধরনের বিকৃত মানসিকতার অপরাধ উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে বলে আশা করা যায়। এখন প্রয়োজন এই রায়ের দ্রুত ও যথাযথ বাস্তবায়ন এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে এমন অমানবিক অপরাধের বিরুদ্ধে সচেতনতার এক দুর্ভেদ্য দুর্গ গড়ে তোলা।