সীমান্ত দিয়ে যেকোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ বা জোরপূর্বক পুশ-ইনের (সীমান্ত পার করে দেওয়ার চেষ্টা) চেষ্টা রুখে দেওয়া হবে বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ভারতের নয়াদিল্লিতে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মহাপরিচালক পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত সম্মেলনের আগের দিন তিনি এই মন্তব্য করেন।
রোববার দুপুরে সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা জানান। সীমান্তে উদ্ভূত সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এবং দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যকার আসন্ন দ্বিপাক্ষিক বৈঠক নিয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, দেশের সীমান্ত সুরক্ষায় নিয়োজিত সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিজিবি) সর্বদা অত্যন্ত সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত সীমান্ত পারাপার ঠেকাতে তারা সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে প্রশ্ন করা হয় যে, সোমবার থেকে ভারতের নয়াদিল্লিতে সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিজিবি) এবং ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) মধ্যে মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক শুরু হতে যাচ্ছে। এমন একটি সময়ে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশ বা জোরপূর্বক পুশ-ইনের বিষয়টি দুই দেশেই বেশ গুরুত্বের সাথে আলোচিত হচ্ছে। এ বিষয়ে সরকারের প্রকৃত অবস্থান কী?
প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এই মহাপরিচালক পর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক আলোচনা বা ডিজিএলটি (মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক) একটি নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ। এই আলোচনাটি পর্যায়ক্রমিকভাবে একবার বাংলাদেশে এবং পরের বার ভারতে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এবার আমাদের প্রতিনিধিদলের ভারতে যাওয়ার পালা। সম্মেলনে সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অনুপ্রবেশ বন্ধ করাসহ সমস্ত অমীমাংসিত বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। আলোচনার পর সিদ্ধান্তগুলো নথিবদ্ধ করে যৌথ স্বাক্ষরের মাধ্যমে চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হবে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সীমান্ত সংক্রান্ত যেকোনো জটিল সংকট কেবল মাঠপর্যায়ে প্রতিরোধ করলেই দীর্ঘমেয়াদে সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন অত্যন্ত কার্যকর কূটনৈতিক যোগাযোগ (ডিপ্লোমেটিক চ্যানেল)। বাংলাদেশ সরকার সবসময় প্রতিবেশী দেশের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখতে সচেষ্ট। তাই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটিয়ে আলোচনার টেবিলে আলোচনার মাধ্যমেই সীমান্ত হত্যা ও অনুপ্রবেশের মতো সংবেদনশীল বিষয়ের স্থায়ী সমাধান করতে চায় ঢাকা। তবে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া চলার পাশাপাশি সীমান্তরক্ষীরা মাঠপর্যায়ে তাদের কড়া নজরদারি ও টহল অব্যাহত রাখবে, যাতে দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিজিবি) এবং ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) মধ্যকার ৫৭তম এই সীমান্ত সম্মেলনটি আগামী ৮ জুন থেকে ১১ জুন পর্যন্ত নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হবে। চার দিনব্যাপী এই সম্মেলনে অংশ নিতে ইতিমধ্যে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল গঠন করা হয়েছে।
বিজিবি মহাপরিচালক উচ্চ সামরিক পদবিধারী (মেজর জেনারেল) মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকীর নেতৃত্বে ১৫ সদস্যের এই বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল ভারতে যাচ্ছে। প্রতিনিধিদলে সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল প্রতিনিধিরাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। অন্যদিকে, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মহাপরিচালকের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী প্রতিনিধিদল ভারতের পক্ষে এই দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় অংশ নেবে।
সম্মেলনে সীমান্ত এলাকায় নিরস্ত্র বেসামরিক বাংলাদেশিদের ওপর গুলি বর্ষণ ও হত্যা বন্ধ করা, মাদক ও অবৈধ অস্ত্র পাচার রোধ করা, আন্তর্জাতিক সীমান্তরেখা লঙ্ঘন করে অনুপ্রবেশ রোধ এবং উভয় বাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধির উপায় নিয়ে গুরুত্বের সাথে আলোচনা করা হবে। বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল সীমান্তে প্রাণহানি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে এবং পুশ-ইনের যেকোনো একতরফা চেষ্টা বন্ধের বিষয়ে ভারতের ওপর জোরালো তাগিদ দেবে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দীর্ঘ সীমান্তে স্থায়ী শান্তি রক্ষা করা দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক ও কৌশলগত সম্পর্কের জন্য অত্যন্ত জরুরি। বারবার সীমান্ত হত্যা এবং জোরপূর্বক অনুপ্রবেশের চেষ্টা দুই দেশের মধ্যকার সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কে ফাটল ধরায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই আশ্বস্তকরণ অত্যন্ত সময়োপযোগী, তবে সীমান্ত সুরক্ষিত রাখতে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যকার শুধু নিয়মিত বৈঠকই যথেষ্ট নয়; বরং রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সুদৃঢ় কূটনৈতিক তৎপরতার সর্বোচ্চ প্রয়োগ ঘটাতে হবে। একটি নিরাপদ, বন্ধুত্বপূর্ণ ও অহিংস সীমান্ত গড়ে তোলাই হোক এই ৫৭তম সম্মেলনের মূল লক্ষ্য।