জাতীয় সংসদে ২০২৬-২০২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে দেশের উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের পানির সংকট দূরীকরণে ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়নে সরকারের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার (২৯ জুন) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংসদ অধিবেশনে তিনি এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের কথা জানান। দীর্ঘ বাজেট আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী দেশের কৃষি, অর্থনীতি, সৃজনশীল শিল্প, শিক্ষা ও জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনার বিশদ চিত্র তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের সাধারণ মানুষের পানি সমস্যা ও নদীভাঙন নিয়ে গভীর উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে বলেন, বর্তমান সরকার উত্তরাঞ্চলের এই সংকটের স্থায়ী সমাধানে সম্পূর্ণভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বর্ষা মৌসুমের অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজে নিরবচ্ছিন্ন সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে সরকার ‘পদ্মা ব্যারাজ’ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর পাশাপাশি জাতীয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যেকোনো মূল্যে ‘তিস্তা ব্যারাজ মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়ন করা হবে।
কৃষি ও সেচ ব্যবস্থার সমন্বিত উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী আগামী পাঁচ বছরে দেশজুড়ে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখনন করার একটি নতুন মহাপরিকল্পনা ঘোষণা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের অনেক অঞ্চলে বর্ষাকালে পর্যাপ্ত পানি থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে তীব্র পানির সংকট দেখা দেয়। এই সমস্যা দূর করতেই এই খনন কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে, যার অংশ হিসেবে গত তিন মাসেই প্রায় ৯০০ কিলোমিটার খাল খননের কাজ সফলভাবে শেষ হয়েছে। এ ছাড়া কৃষকদের সহায়তায় সরকার গঠনের প্রথম সপ্তাহেই ১৩ লাখ কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ সম্পূর্ণ মওকুফ করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরের মধ্যে দেশের ৪৩ লাখ কৃষকের হাতে বিশেষ ‘কৃষক কার্ড’ পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মাধ্যমে প্রতি বছর সরাসরি আর্থিক সহায়তাসহ কৃষকেরা ১০টি বিশেষ সুবিধা পাবেন।
ঐতিহ্যবাহী খাতের পাশাপাশি দেশের চলচ্চিত্র, ওটিটি (ইন্টারনেটভিত্তিক বিনোদন মাধ্যম), ডিজিটাল কনটেন্ট (অনলাইন তথ্য-সামগ্রী), গেমিং (ভিডিও গেম উন্নয়ন) ও সফটওয়্যার (কম্পিউটার প্রোগ্রাম) খাতকে ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ বা সৃজনশীল অর্থনীতি হিসেবে দেশের মূল ধারায় যুক্ত করার ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া ক্রীড়াঙ্গনকে পেশা হিসেবে জনপ্রিয় করতে খেলোয়াড়দের জন্য একটি ‘জাতীয় সম্মানী কাঠামো’ এবং শিক্ষা কারিকুলামে খেলাধুলাকে একটি স্বাধীন বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার কাজ চলছে বলে তিনি জানান। পাশাপাশি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের চালু করা ঐতিহাসিক ‘নতুন কুঁড়ি’র আদলে খেলাধুলার জন্য একটি নতুন ক্রীড়া আসর চালুর ঘোষণাও দেন তিনি।
প্রবাসীদের অধিকার রক্ষায় ও তাৎক্ষণিক সমস্যা সমাধানে একটি যুগান্তকারী ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর কাজ চলছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নতুন নতুন বৈশ্বিক শ্রমবাজার উন্মোচনে সরকার সচেষ্ট রয়েছে। দেশের জ্বালানি ও শিক্ষা খাতের অতীত অব্যবস্থাপনার তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের মাধ্যমে জ্বালানি খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। পরিশেষে প্রধানমন্ত্রী অতীতের সমস্ত ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে যুবসমাজের স্বপ্নের একটি স্বনির্ভর, শিক্ষিত ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন নতুন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।