শেকড়ের টানে আপনজনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে যাওয়া ঘরমুখো মানুষের যাত্রা এবার সম্পূর্ণ স্বস্তিদায়ক, নিরাপদ ও বাধাহীন হবে। মহাসড়কে যানজট ও অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়াতে ঈদের আগে ও পরে সড়কের পাশে কোনো ধরনের অস্থায়ী হাট বসতে দেওয়া হবে না বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
প্রতি বছর ঈদের ছুটিতে রাজধানীসহ বড় শহরগুলো থেকে লাখ লাখ মানুষ নাড়ির টানে নিজেদের গ্রামের বাড়িতে ছুটে যান। কিন্তু এই আনন্দময় যাত্রার পথে দীর্ঘ যানজট আর অনাকাঙ্ক্ষিত সড়ক দুর্ঘটনা সাধারণ মানুষের জন্য এক বড় আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে মহাসড়কগুলোর বেহাল দশা এবং সড়কের ওপর যত্রতত্র গড়ে ওঠা অস্থায়ী বাজার যাত্রীদের চরম ভোগান্তিতে ফেলে। তবে এবারের ঈদযাত্রায় সাধারণ মানুষকে সেই চিরচেনা দুর্ভোগ পোহাতে হবে না বলে জোরালো আশ্বাস দিয়েছে সরকার।
রোববার (২৪ মে) বিকেলে গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈরে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ এবং নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পরিবহন শ্রমিকদের নিয়ে এক বিশেষ মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। সেই গুরুত্বপূর্ণ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম আসন্ন ঈদযাত্রা নিয়ে সরকারের এই কঠোর ও ইতিবাচক অবস্থানের কথা তুলে ধরেন।
মন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে মহাসড়কের যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে সড়কের পাশে গড়ে ওঠা অস্থায়ী পশুর হাটগুলোকে দায়ী করেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানান, ঈদের আগে কিংবা পরে কোনো অবস্থাতেই দেশের কোনো মহাসড়কের পাশে বা কাছাকাছি পশুর হাট বা সাধারণ বাজার বসতে দেওয়া হবে না। কারণ, এসব হাটের কারণে মহাসড়কের প্রশস্ততা কমে যায়, পশুবাহী ধীরগতির গাড়ির কারণে যানজট সৃষ্টি হয় এবং সাধারণ মানুষের এলোমেলো চলাচলের ফলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এই নির্দেশ অমান্য করলে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
ঈদযাত্রাকে নির্বিঘ্ন করতে সড়কের ভৌত কাঠামোর দিকেও বিশেষ নজর দেওয়ার কথা জানিয়েছেন মন্ত্রী। দীর্ঘদিন ধরে ভারী যানবাহন চলাচল ও প্রাকৃতিক কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কগুলোর চলমান সংস্কারকাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে বলে তিনি সভাকে অবহিত করেন। ঈদের আগেই এসব সংস্কারকাজ সম্পন্ন করে সড়কগুলো যান চলাচলের জন্য পুরোপুরি উপযোগী করে তোলার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সভায় উপস্থিত পরিবহন শ্রমিক ও চালকেরা মহাসড়কে যান চলাচলের ক্ষেত্রে নিজেদের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গগামী যানবাহনের অন্যতম প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত কালিয়াকৈরে যানবাহনের চাপ সামলাতে ও সুশৃঙ্খলভাবে গাড়ি পার্ক করার জন্য শ্রমিক নেতারা একটি আধুনিক আন্তজেলা বাস টার্মিনাল (দূরপাল্লার যাত্রীবাহী যানবাহন রাখার ও ছাড়ার নির্দিষ্ট স্থান) নির্মাণের জোর দাবি জানান।
শ্রমিকদের এই দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে মন্ত্রী বলেন, সরকার পরিবহন শ্রমিকদের কল্যাণে কাজ করতে সবসময় বদ্ধপরিকর। তবে সবার আগে দেশের সড়কগুলোতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। চালকদের বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো বন্ধ করতে হবে এবং ট্রাফিক আইন (সড়কে চলাচলের নিয়মকানুন) যথাযথভাবে মেনে চলতে হবে। সড়কে কাঙ্ক্ষিত শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হলে পরিবহন শ্রমিকদের সব যৌক্তিক দাবি সরকার পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করবে বলে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন।
সড়ক নিরাপত্তা ও পরিবহন ব্যবস্থাপনার এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সভায় সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রহমান রশীদ, স্থানীয় সংসদ সদস্য শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস ও মজিবুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও মাঠপর্যায়ে সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা জেলা প্রশাসক নুরুল করিম ভূঁইয়া, জেলা পুলিশ সুপার (প্রধান) শরিফ উদ্দিন, প্রবীণ শ্রমিক নেতা হুমায়ুন কবির খানসহ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং পরিবহন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই সভায় অংশগ্রহণ করেন।
প্রতি বছরই ঈদের আগে সরকারের পক্ষ থেকে স্বস্তিদায়ক ঈদযাত্রার এমন প্রতিশ্রুতি শোনা যায়, কিন্তু বাস্তব চিত্র অনেক সময়ই ভিন্ন হয়। মহাসড়কের পাশে পশুর হাট না বসতে দেওয়ার যে কঠোর সিদ্ধান্ত সরকার নিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে এই ঘোষণার সফলতা পুরোপুরি নির্ভর করছে মাঠপর্যায়ে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষ এবং কঠোর নজরদারির ওপর। পাশাপাশি, পরিবহন শ্রমিক ও সাধারণ যাত্রীদেরও নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। চালকেরা যদি অতিরিক্ত লাভের আশায় বেপরোয়া গতিতে গাড়ি না চালান এবং যাত্রীরা যদি তাড়াহুড়ো না করেন, তবেই হয়তো আমরা একটি সত্যিকারের দুর্ঘটনামুক্ত ও স্বস্তিদায়ক ঈদযাত্রা দেখতে পাব। একটি নিরাপদ সড়ক কেবল সরকারের একার পক্ষে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন সবার সম্মিলিত সদিচ্ছা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ।