রাজধানীর যানজটহীন ও দ্রুতগতির আধুনিক গণপরিবহন মেট্রোরেল চলাচলের সময় রাতের দিকে আরও ২০ মিনিট বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। আগামী রবিবার (৭ জুন) থেকে নতুন এই সময়সূচি কার্যকর হচ্ছে, যা বিশেষ করে রাতের বেলা যাতায়াতকারী চাকরিজীবী ও সাধারণ যাত্রীদের ঘরে ফেরা অনেক সহজ করবে। ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) সংবাদমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের দেওয়া তথ্যমতে, আগামী রবিবার থেকে মেট্রোরেল চলাচলের সময় রাতের দিকে উভয় প্রান্তেই ২০ মিনিট করে বৃদ্ধি করা হচ্ছে। নতুন এই সময়সূচি অনুযায়ী, মতিঝিল স্টেশন থেকে উত্তরার উদ্দেশে সর্বশেষ ট্রেনটি ছেড়ে যাবে রাত সাড়ে ১০টায়, যা আগে রাত ১০টা ১০ মিনিটে ছেড়ে যেত। একইভাবে, উত্তরা উত্তর স্টেশন থেকে মতিঝিলের উদ্দেশে দিনের শেষ ট্রেনটি ছাড়বে রাত ৯টা ৫০ মিনিটে, যা বর্তমান সময়সূচি অনুযায়ী রাত ৯টা ৩০ মিনিটে ছেড়ে যায়। এই সময় বৃদ্ধির ফলে গভীর রাত পর্যন্ত যাতায়াতকারী নগরবাসী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন।
মেট্রোরেল পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রাতের বেলায় চলাচলের সময় এক লাফে না বাড়িয়ে বেশ কিছুদিন ধরে এ বিষয়ে নিবিড় পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়েছে। গত প্রায় এক মাস ধরে বিভিন্ন কারিগরি ও যাত্রীচাহিদা সংক্রান্ত বিষয় যাচাইয়ের পর এই বাড়তি সময়সূচি চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে প্রাথমিকভাবে এই বর্ধিত ২০ মিনিটে উভয় প্রান্ত থেকে মাত্র একটি করে অতিরিক্ত ট্রিপ (একমুখী যাত্রা) পরিচালনা করা হবে। অর্থাৎ একটি ট্রেন মতিঝিল থেকে উত্তরার দিকে এবং অপর একটি ট্রেন উত্তরা থেকে মতিঝিলের দিকে যাত্রা করবে। এই বাড়তি সময়ে এক ট্রেনের পর অন্য ট্রেনের মধ্যকার বিরতি থাকবে ১০ মিনিট।
ডিএমটিসিএলের পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স) নজরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘রাতে দুই দিক থেকেই মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ানোর জন্য আমাদের কারিগরি ও প্রশাসনিক সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। আশা করছি, রবিবার থেকে রাতের এই বর্ধিত সময়সূচি সফলভাবে চালু করা সম্ভব হবে, যা যাত্রীদের রাতের যাতায়াতকে আরও নিরাপদ ও আরামদায়ক করবে।’
বর্তমানে নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৬টায় উত্তরা উত্তর স্টেশন থেকে মতিঝিলগামী দিনের প্রথম মেট্রোরেলটি ছেড়ে আসে। অন্যদিকে মতিঝিল থেকে উত্তরার উদ্দেশে দিনের প্রথম ট্রেনটি ছাড়ে সকাল সোয়া ৭টায়। তবে রাতের বেলা চলাচলের সময় বাড়ানো হলেও সকালের সময়সূচি পরিবর্তনের কোনো পরিকল্পনা আপাতত নেই বলে স্পষ্ট করেছে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ। সাধারণত রাতের শেষ ট্রিপের পর এবং ভোরের প্রথম ট্রিপ শুরু হওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে রেললাইন, বিদ্যুৎ সংযোগ এবং ট্রেনের বিভিন্ন কারিগরি পরীক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ সম্পন্ন করা হয়। তাই নিরাপত্তা ও নিখুঁত পরিচালন ব্যবস্থার স্বার্থেই সকালের সময় অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
ঢাকা একটি দ্রুত বর্ধনশীল মেগাসিটি, যেখানে বেসরকারি খাত, তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, বিপণিবিতান এবং বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠান গভীর রাত পর্যন্ত সচল থাকে। মতিঝিল ও কারওয়ান বাজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা থেকে কাজ শেষ করে রাতের বেলা উত্তরার মতো দূরবর্তী গন্তব্যে ফেরার জন্য হাজার হাজার মানুষকে প্রতিদিন গণপরিবহনের সংকটে পড়তে হতো। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা, অতিরিক্ত বাস ভাড়া এবং যানজটের ভোগান্তি থেকে এই ২০ মিনিটের বাড়তি সময়সূচি চাকরিজীবী ও সাধারণ যাত্রীদের বড় ধরনের স্বস্তি দেবে বলে মনে করছেন নগর পরিকল্পনাবিদেরা।
মেট্রোরেলের এই সময়সীমা বৃদ্ধির সিদ্ধান্তটি আপাতদৃষ্টিতে ছোট মনে হলেও, রাতের ঢাকাকে সচল রাখতে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। রাজধানী ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় মেট্রোরেল যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে, এই সিদ্ধান্তটি তারই ধারাবাহিকতা। তবে সময়ের এই সামান্য বৃদ্ধির ফলে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বরাদ্দ সময়ে কোনো প্রভাব পড়বে কি না, তা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। একটি নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন হিসেবে মেট্রোরেলের সময়ানুবর্তিতা এবং নিরাপত্তা বজায় রাখাই হবে কর্তৃপক্ষের জন্য আসল চ্যালেঞ্জ। নগরবাসীর সুবিধার্থে ভবিষ্যতে ট্রেনের সংখ্যা বাড়িয়ে যাত্রার ব্যবধান আরও কমিয়ে আনা যায় কি না, তা নিয়ে নীতিনির্ধারকদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।