দেশের লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী এবং তাদের ওপর নির্ভরশীল কোটি মানুষের জীবিকা রক্ষার্থে রাত ১০টা পর্যন্ত দোকান ও বিপণিবিতান খোলা রাখার অনুমতি চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে এ সংক্রান্ত একটি লিখিত চিঠি পাঠানো হয়েছে। বর্তমানের সন্ধ্যা ৭টার পরিবর্তে প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চালু রাখার দাবি জানিয়েছেন দেশের ব্যবসায়ী নেতারা।
সোমবার বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি নাজমুল হাসান মাহমুদ গণমাধ্যমকে এই আবেদনপত্রের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া চিঠিতে সংগঠনটি উল্লেখ করেছে, দেশের কোটি কোটি ভোক্তা এবং প্রায় ৭০ লক্ষ দোকান মালিক ও কর্মচারীর জীবন-জীবিকার স্বার্থেই তারা এই আবেদন জানাতে বাধ্য হয়েছেন। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় খুচরা ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখা এখন সময়ের দাবি।
ব্যবসায়ী নেতারা জানান, দেশের শহর, মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল চালিকাশক্তি হলো খুচরা ব্যবসা। এই খাতের ওপর ভিত্তি করে দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়া দোকান ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণের কিস্তি এবং কর্মচারীদের বেতন-ভাতা মেটাতে গিয়ে ব্যবসায়ীরা চরম সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে দোকান বন্ধ করে দেওয়ার বর্তমান সরকারি সিদ্ধান্ত ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, কর্মজীবী ও ব্যস্ত ক্রেতারা সাধারণত দিনের বেলায় কেনাকাটার সুযোগ পান না। তারা বিকেল অথবা সন্ধ্যার পরেই বাজার বা বিপণিবিতানগুলোতে আসেন। ফলে রাত ১০টা পর্যন্ত বেচাকেনার সুযোগ না থাকলে ব্যবসায়ীরা তাদের কাঙ্ক্ষিত পণ্য বিক্রির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এর ফলে সামগ্রিক বিক্রির পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে, যা কেবল ব্যবসায়ীদেরই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং অনেক কর্মচারীর চাকরিচ্যুতির আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং সার্বিকভাবে জাতীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে শ্লথ করে তুলছে।
ব্যবসায়ী মালিক সমিতি বিনীত অনুরোধ জানিয়ে বলেছে, বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও দেশের অর্থনীতি সচল রাখার মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। সরকারের নির্ধারিত সময় অনুযায়ী প্রতিদিন দুপুর ১২টা বা অন্য যেকোনো সুবিধাজনক সময় থেকে শুরু করে রাত ১০টা পর্যন্ত দেশের সমস্ত দোকান, বিপণিবিতান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখার অনুমোদন দেওয়া প্রয়োজন। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৭০ লক্ষ মানুষের জীবিকা সুরক্ষিত হবে, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে, সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে এবং সাধারণ মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে কেনাকাটার সুযোগ পাবেন। অন্যথায় অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী দেউলিয়া হয়ে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে বাধ্য হবেন, যা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে।
উল্লেখ্য, বিদ্যুৎ ব্যবহারের সাশ্রয় নিশ্চিত করতে গত ১ জুন সরকারের বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে দেশের সব বিপণিবিতান, বাজার ও দোকানপাট সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ করার নির্দেশ জারি করা হয়। সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও প্রশাসক, বিভাগীয় কমিশনার এবং জেলা প্রশাসকদের কাছে পাঠানো নির্দেশনায় জানানো হয়, এর আগে পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে দোকানপাট খোলা রাখার সময়সীমা সাময়িকভাবে রাত ১০টা পর্যন্ত বাড়ানো হলেও, উৎসবের ছুটি শেষ হওয়ায় ১ জুন থেকে পুনরায় আগের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। একই সাথে সব ধরনের বড় বিজ্ঞাপন ফলক এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে চলমান মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ করার আদেশ বহাল রয়েছে।
বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সরকারের সাশ্রয়ী নীতি যৌক্তিক হলেও অর্থনীতির চাকা সচল রাখার বিষয়টি উপেক্ষা করা কঠিন। সন্ধ্যা ৭টায় দোকানপাট বন্ধের সিদ্ধান্ত বিদ্যুৎ সাশ্রয় করলেও তা দেশের খুচরা বাজার ব্যবস্থায় এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি করছে। কোটি মানুষের কর্মসংস্থান জড়িয়ে রয়েছে যে খাতের সাথে, তাকে দীর্ঘ সময় ধরে সংকুচিত করে রাখা হলে সাধারণ মানুষের আয় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সরকারের উচিত বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের বিকল্প পথ খোঁজা এবং ব্যবসায়ীদের সাথে আলোচনা করে এমন একটি মধ্যপন্থী সময়সীমা নির্ধারণ করা, যা বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও অর্থনৈতিক সচলতা উভয়েরই ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে