রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে শিশু রামিসাকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে সৃষ্ট ক্ষোভের প্রেক্ষাপটে কঠোর বার্তা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানিয়েছেন, এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের বিচারিক প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হবে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও রামিসা হত্যাকাণ্ড নিয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, শিশু রামিসা হত্যার ঘটনার পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অভিযুক্ত ব্যক্তি আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দিও দিয়েছে। এখন দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন ও অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেওয়া হবে এবং বিচারিক প্রক্রিয়াও স্বল্প সময়ে সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
মন্ত্রী আরও বলেন, সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই মাদক, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর অপরাধের প্রতিটি ক্ষেত্রেই পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতির যে অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়, তার প্রেক্ষিতে মন্ত্রী বলেন, বিচার প্রক্রিয়া আদালতের নিজস্ব গতিতে চলে, সেখানে অনেক সময় কিছু আইনি জটিলতার কারণে দেরি হতে পারে। তবে তনু হত্যাসহ অন্যান্য আলোচিত মামলাগুলোতেও সরকার তৎপর রয়েছে।
সরকারের কার্যক্রম সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকারের বয়স মাত্র তিন মাস। এই অল্প সময়ে সবকিছু রাতারাতি বদলে ফেলা সম্ভব নয়। আইন সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং দেশের প্রয়োজনে কিছু সংশোধন আনা প্রয়োজন। তবে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, জনগণের তাৎক্ষণিক ক্ষোভ মেটানোর জন্য তাড়াহুড়ো করে কোনো আইন প্রণয়ন করা সবসময় ভালো ফল বয়ে আনে না। আইনি প্রক্রিয়ায় তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে যেন আবার কোনো অবিচার না হয়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।
এদিকে, এই হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, মাগুরার আছিয়া কিংবা ঢাকার রামিসার মতো ঘটনাগুলো আমাদের মানবিকতার ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। এমন জঘন্য অপরাধ কোনোভাবেই বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেওয়া হবে না। পল্লবীর ঘটনায় পুলিশ কমিশনারকে এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারলে হয়তো রামিসার শোকাহত বাবার প্রশ্নের কিছুটা হলেও জবাব দেওয়া সম্ভব হবে। তবে বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীন হওয়ায় নির্বাহী বিভাগ থেকে কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করা সম্ভব নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার সকালে পল্লবীর একটি ফ্ল্যাটের খাটের নিচ থেকে আট বছর বয়সী শিশু রামিসার মস্তকবিহীন দেহ এবং বাথরুম থেকে তার খণ্ডিত মাথা উদ্ধার করে পুলিশ। এই মর্মান্তিক ঘটনার পর এলাকায় ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে প্রথমে স্বপ্না আক্তার নামের এক নারীকে এবং পরবর্তীতে সোহেল রানা নামের একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সোহেল শিশুটিকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার কথা স্বীকার করেছে।
শিশু রামিসার হত্যাকাণ্ড কেবল একটি ফৌজদারি অপরাধ নয়, এটি আমাদের সামাজিক নিরাপত্তার এক গভীর সংকটের প্রতিফলন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীর আশ্বাস আশার আলো দেখালেও, দেশের মানুষ এখন আর শুধু মুখের কথায় ভরসা রাখতে চাইছে না। অপরাধীর দ্রুত বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই পারে এই ধরনের পৈশাচিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্র কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে, তার পরীক্ষা হবে এই মামলার চূড়ান্ত রায়ের মাধ্যমে।