কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব রান্নার জ্বালানি নিশ্চিত করতে বড় ধরনের আর্থিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে কানাডা। দেশটির সরকার এক কোটি কানাডীয় ডলার (প্রায় ৮৫ কোটি টাকা) অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, যা মূলত বন উজাড় রোধ এবং নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যয় করা হবে। এই পদক্ষেপের ফলে বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবিরের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার লড়াই আরও বেগবান হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মিয়ানমার থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা বিশাল এই জনগোষ্ঠীর রান্নার চাহিদা মেটাতে শুরুর দিকে ব্যাপকভাবে বনের কাঠ ব্যবহার করা হতো। এতে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের বিশাল বনাঞ্চল উজাড় হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। এই সংকট মোকাবিলায় ২০১৮ সাল থেকে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি (সিলিন্ডার গ্যাস) বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বর্তমানে সেই কার্যক্রমকে আরও টেকসই ও শক্তিশালী করতে কানাডা এই বিশাল অংকের অনুদান প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ঢাকায় অবস্থিত কানাডা হাইকমিশন এবং জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) গত রোববার এক যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে এই আনন্দের খবরটি নিশ্চিত করেছে। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, এই অর্থ সরাসরি জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মাধ্যমে রোহিঙ্গা শিবিরে জ্বালানি সরবরাহ ও পরিবেশ রক্ষায় ব্যয় করা হবে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এলপিজি গ্যাসের ব্যবহার শুরু হওয়ার পর থেকে বনের কাঠ কাটার পরিমাণ প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে পরিবেশের ওপর। প্রতিবছর প্রায় চার লাখ সাত হাজার টন ক্ষতিকর কার্বন ডাই-অক্সাইড (এক ধরনের বিষাক্ত গ্যাস যা বাতাসকে উত্তপ্ত করে) নিঃসরণ রোধ করা সম্ভব হচ্ছে। বিপুল এই কার্বন নিঃসরণ বন্ধ হওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ বড় ধরনের সাফল্য পাচ্ছে।
কানাডা হাইকমিশনের মতে, এই উদ্যোগ কেবল পরিবেশ রক্ষাই নয়, বরং শরণার্থী শিবিরের ভেতরে বসবাসরত নারী ও শিশুদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশাল ভূমিকা রাখছে। আগে রান্নার কাঠ সংগ্রহের জন্য নারী ও শিশুদের গভীর বনে যেতে হতো, যেখানে বন্যপ্রাণীর আক্রমণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ও সামাজিক লাঞ্ছনার ঝুঁকি থাকত। এখন হাতের কাছে জ্বালানি পাওয়ায় সেই ঝুঁকি যেমন কমেছে, তেমনি ঘরের ভেতরে ধোঁয়ামুক্ত পরিবেশে রান্নার ফলে শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগ থেকেও তারা মুক্তি পাচ্ছে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত কানাডার হাইকমিশনার অজিত সিং তার বক্তব্যে বলেন, "কানাডা দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশে চলমান এই রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে অংশীদার হিসেবে কাজ করছে। আমাদের এই জলবায়ু-সচেতন সহায়তা কেবল পরিবেশ রক্ষাই করবে না, বরং বন উজাড় রোধ করে শরণার্থীদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।" তিনি আরও যোগ করেন যে, কক্সবাজারের মতো পরিবেশগতভাবে স্পর্শকাতর এলাকায় স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং শরণার্থী উভয়ের জন্যই এই অনুদান কল্যাণ বয়ে আনবে।
ইউএনএইচসিআর বাংলাদেশের উপ-প্রতিনিধি জুলিয়েট মুরেকিইসোনি বলেন, রোহিঙ্গারা প্রায় নয় বছর ধরে অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে বাস্তুচ্যুত জীবন যাপন করছেন। তাদের মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে কানাডার এই নিরবচ্ছিন্ন সহায়তা অত্যন্ত জরুরি ছিল। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মিশন প্রধান জ্যাসেপ্পে লোপ্রিট মন্তব্য করেন যে, নিরাপদ জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমরা শরণার্থী পরিবারগুলোর মৌলিক চাহিদা পূরণ করছি এবং তাদের জীবনের ঝুঁকি কমিয়ে আনছি।
যৌথ বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, কানাডার এই নতুন অনুদান প্রায় দুই লাখ ৪৩ হাজার ৫০০ রোহিঙ্গা পরিবারের এলপিজি সুবিধা নিশ্চিত করবে। এর পাশাপাশি কক্সবাজারের প্রায় ১০ হাজার ৭০০ হেক্টর সংরক্ষিত বনভূমি রক্ষা পাবে। উল্লেখ্য যে, এই বন রক্ষা পাওয়ার ফলে পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি অনেকাংশে কমে আসবে। একইসঙ্গে বনের গভীরে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর (বিশেষ করে বুনো হাতি) যে দ্বন্দ্ব তৈরি হতো, তাও নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে পরিবেশবাদীরা মনে করছেন।
রোহিঙ্গা সংকটের সাত বছর পেরিয়ে গেলেও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এখনো অনিশ্চিত। এমন পরিস্থিতিতে বিশাল এই জনগোষ্ঠীর দৈনিক চাহিদা মেটাতে গিয়ে স্থানীয় প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর যে ভয়াবহ চাপ তৈরি হচ্ছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কানাডার এই সহায়তা সাময়িকভাবে বন রক্ষা এবং মানবিক চাহিদা মেটাতে সক্ষম হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর কতটুকু চাপ কমাবে, তা নিয়ে ভাবনার অবকাশ রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কেবল ত্রাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের দিকে আরও জোরালো নজর দিতে হবে। কারণ, টেকসই সমাধান ছাড়া কেবল সাহায্য দিয়ে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের পরিবেশ ও অর্থনীতিকে দীর্ঘকাল সুরক্ষা দেওয়া কঠিন হতে পারে।