লালমনিরহাট জেলার সীমান্ত এলাকার তিনটি ভিন্ন স্থানে একযোগে ৩৩ জন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার ভারতীয় রক্ষীবাহিনীর এক গভীর চক্রান্ত সাহসিকতার সঙ্গে রুখে দিয়েছে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী। শুক্রবার ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘটে যাওয়া এই উত্তেজনাকর ঘটনার পর থেকে পুরো সীমান্তজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা ও সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
শুক্রবার, ৫ জুন। সকালের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি, চারদিকে ভোরের স্নিগ্ধতা বিরাজ করছিল। ঠিক এমন সময়ে লালমনিরহাট জেলার বিস্তীর্ণ সীমান্ত এলাকায় রচিত হচ্ছিল এক নীরব ও বেআইনি চক্রান্ত। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ছত্রচ্ছায়ায় একযোগে তিনটি পৃথক স্থান দিয়ে ৩৩ জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে জোরপূর্বক বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ঠেলে দেওয়ার (যাকে বেআইনি অনুপ্রবেশ বলা হয়) এক সুপরিকল্পিত অপচেষ্টা চালানো হয়। তবে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের অতন্দ্র প্রহরার কারণে তাদের সেই চক্রান্ত মুহূর্তের মধ্যেই ব্যর্থ হয়ে যায়।
বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ১৫ ও ৬১ নম্বর দলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই উত্তেজনাকর ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তারা জানিয়েছেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এবং নিয়মিত পাহারার অংশ হিসেবে বাংলাদেশের রক্ষীরা অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ঘটনাস্থলে পৌঁছে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন, যার ফলে একটি বড় ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
সীমান্তরক্ষী বাহিনীর দেওয়া বিস্তারিত তথ্য অনুযায়ী, তিস্তা তীরবর্তী ৬১ নম্বর দলের অধীনস্থ বড়খাতা সীমান্ত ফাঁড়ি এলাকায় শুক্রবার সকালে হঠাৎ করে ১১ জন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে জোর করে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হয়। এই দলটির মধ্যে তিনজন পুরুষ এবং আটজন নারী ছিলেন। প্রায় একই সময়ে কাছাকাছি অবস্থিত পয়ষট্টিবাড়ি সীমান্ত ফাঁড়ি এলাকা দিয়ে আরও ১০ জনকে একইভাবে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চলে। এই দলে পাঁচজন পুরুষ এবং পাঁচজন নারী ছিলেন।
খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী দলের সদস্যরা কালক্ষেপণ না করে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং সীমানা ঘেঁষে অত্যন্ত কড়া ও শক্ত অবস্থান নেন। রক্ষীদের এমন কঠোর ও অনড় মনোভাব দেখে অনুপ্রবেশকারীরা ভয় পেয়ে যায় এবং তাদের পেছনে থাকা ভারতীয় বাহিনীর সদস্যরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। ফলে ওই ২১ জন ব্যক্তি কোনোভাবেই আন্তর্জাতিক সীমানা অতিক্রম করে বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি। বর্তমানে তারা বাধ্য হয়ে ভারতের অভ্যন্তরেই অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। এই ঘটনার পরপরই ওই স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে রক্ষীদের নজরদারি ও পাহারার মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
উত্তেজনার এখানেই শেষ নয়। একই দিন ভোর আনুমানিক সাড়ে পাঁচটার দিকে ১৫ নম্বর দলের আওতাধীন দুর্গাপুর এবং দিঘলটারী সীমান্ত ফাঁড়ি এলাকার ৯২৫ এবং ৯২৭/৭এস নম্বর সীমানা খুঁটির কাছাকাছি এলাকায় আরও ১২ জন সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে ভারতীয় সীমান্তের ভেতরে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়। কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে তাদের উদ্দেশ্য সন্দেহজনক হওয়ায় বাংলাদেশের রক্ষীরা তাৎক্ষণিকভাবে শব্দযন্ত্রের (মাইক) মাধ্যমে উচ্চস্বরে সতর্কবার্তা প্রচার করতে শুরু করেন। এই কড়া সতর্কবার্তার পর ওই সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা আর সীমানা অতিক্রম করার সাহস দেখায়নি এবং সেখানেই থমকে দাঁড়ায়।
পরিস্থিতি পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী নিয়ম অনুযায়ী ভারতীয় রক্ষীবাহিনীর সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে যোগাযোগের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মূলত ওই অজ্ঞাত ব্যক্তিদের প্রকৃত পরিচয় কী এবং কেন তাদের এভাবে রাতের অন্ধকারে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল, তা নিশ্চিত হতেই এই যোগাযোগ করা হচ্ছে। তবে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ওই ৩৩ জনের কাউকেই এক চুল পরিমাণও বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।
সীমান্তের স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সীমানা এলাকা দিয়ে এ ধরনের জোরপূর্বক মানুষ ঠেলে দেওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এতে স্থানীয় সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের চাপা আতঙ্ক কাজ করছে। তবে এ পরিস্থিতিতে এলাকার নিরাপত্তা শতভাগ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের রক্ষীরা দিবা-রাত্র অবিরাম পাহারা দিয়ে যাচ্ছেন এবং ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা অব্যাহত রেখেছেন।
আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে রাতের অন্ধকারে সাধারণ মানুষকে জোরপূর্বক অন্য দেশের ভূখণ্ডে ঠেলে দেওয়ার এই ভারতীয় অপচেষ্টা অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে চরম অগ্রহণযোগ্য। এ ধরনের উসকানিমূলক কাজ দুটি প্রতিবেশী দেশের মধ্যকার পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ককে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী সাহসিকতার সঙ্গে তাৎক্ষণিক যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। তবে কেবল পাহারায় সীমাবদ্ধ না থেকে কূটনৈতিক পর্যায়ে এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানানো উচিত, যাতে ভবিষ্যতে কেউ বাংলাদেশের সীমান্ত নিয়ে এ ধরনের ছিনিমিনি খেলার সাহস না পায়। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সীমান্ত তার সার্বভৌমত্বের প্রতীক, আর তা রক্ষায় যেকোনো আপসহীন অবস্থানই দেশবাসীর কাম্য।