শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত চলমান এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত রাখা এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারা শিক্ষার্থীদের জন্য পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থা করার দাবিতে সচিবালয় অভিমুখে ‘লং মার্চ’ (দীর্ঘ পদযাত্রা) কর্মসূচি পালন করেছে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীরা। নতুন নির্বাচিত সরকারের ৫ মাসের মাথায় একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
টানা ভারী বর্ষণ ও জলাবদ্ধতার মধ্যে পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে পরীক্ষার্থীরা বেশ কিছুদিন ধরে আন্দোলন করে আসছিল। এরই মধ্যে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলনের একটি মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তিনি শিক্ষার্থীদের ‘ফার্মের মুরগি’ বলে মন্তব্য করেন, যা নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। এর জের ধরে শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসেন এবং সংসদ ভবনের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শনের পর সচিবালয় অভিমুখে পদযাত্রা শুরু করেন। এ সময় শিক্ষার্থীরা স্লোগানের মাধ্যমে মন্ত্রীর মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং তাঁর পদত্যাগ দাবি করেন।
রক্তক্ষয়ী জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ দেড় যুগ পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। বিশেষ করে যে ছাত্রসমাজ বুকের রক্ত দিয়ে এই পরিবর্তন এনেছে, তাদের প্রতি প্রশাসনের দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশিত ছিল। শিক্ষামন্ত্রীর এই মন্তব্যকে অত্যন্ত দুঃখজনক বলে আখ্যা দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক কমিটির (এনসিপি) অন্যতম নেতা ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “যে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটেছে এবং আপনারা ক্ষমতার চেয়ারে বসেছেন, তাদের ‘ফার্মের মুরগি’ বলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।”
শুধু বিতর্কিত মন্তব্যই নয়, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় কোমরসমান পানির মধ্যে পরীক্ষা নিতে বাধ্য করা এবং পরীক্ষাগুলোতে প্রশ্নপত্রের মারাত্মক ভুলের কারণেও তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, পরীক্ষাকেন্দ্রে যাওয়ার মতো স্বাভাবিক পরিস্থিতি না থাকা সত্ত্বেও তাদের পরীক্ষা দিতে বাধ্য করা হয়েছে। তার ওপর প্রশ্নপত্রে ভুল থাকায় পরীক্ষার্থীরা মারাত্মক মানসিক চাপের মধ্যে পড়েছে। এনসিপির দক্ষিণ অঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ ও নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারীও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই চরম অব্যবস্থার কড়া সমালোচনা করে মন্ত্রীকে অবিলম্বে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানান।
পরিস্থিতি সামাল দিতে শিক্ষামন্ত্রী ইতিমধ্যেই নিজের বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং ভুল স্বীকার করেছেন। তবে তাঁর এই দুঃখ প্রকাশেও শান্ত হননি আন্দোলনরত পরীক্ষার্থীরা। তারা অবিলম্বে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং তিন দফা দাবি বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রেখেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের চিন্তার জগতে বড় পরিবর্তন এসেছে। যেকোনো অন্যায্য সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে দাবি আদায়ের ব্যাপারে তারা অত্যন্ত সচেতন। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের মন্ত্রী ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কথাবার্তায় আরও সংযমী ও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে সরকারকে দ্রুত শিক্ষার্থীদের দাবি বিবেচনা করে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।