দেশের চিকিৎসাসেবার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং চিকিৎসকদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির জেরে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসা কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে রাজধানীসহ দেশের দূর-দূরান্ত থেকে আসা শত শত মুমূর্ষু রোগী ও তাদের স্বজনরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
বুধবার (৮ এপ্রিল) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে কেন্দ্র করে এই উত্তেজনার সূত্রপাত হয়। প্রত্যক্ষদর্শী ও হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিকেল নাগাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অমর একুশে হলের আবাসিক শিক্ষার্থী এবং ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের উদ্ভিদবিজ্ঞান (বোটানি) বিভাগের ছাত্র সানিম জরুরি বিভাগে চিকিৎসার জন্য আসেন। কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে প্রয়োজনীয় ওষুধের একটি তালিকা বা ব্যবস্থাপত্র লিখে দেন। তবে ব্যবস্থাপত্রে উল্লিখিত নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ হাসপাতালের নিজস্ব ভাণ্ডারে বা সরবরাহে না থাকায়, চিকিৎসক তাকে সেগুলো বাইরের দোকান থেকে কিনে আনতে বলেন।
কিছুক্ষণ পর ওই শিক্ষার্থী তার কয়েকজন সহপাঠীকে সঙ্গে নিয়ে পুনরায় হাসপাতালে ফিরে আসেন এবং চিকিৎসকদের সঙ্গে তর্কে লিপ্ত হন। তাদের দাবি ছিল, চিকিৎসকের লিখে দেওয়া ওই ওষুধগুলো আশপাশের কোনো দোকানে পাওয়া যাচ্ছে না। এই নিয়ে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং তা হাতাহাতিতে রূপ নেয়। মুহূর্তের মধ্যেই খবরটি ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। দুই পক্ষের মধ্যে কয়েক দফা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।
অমর একুশে হলের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সানিম চিকিৎসার জন্য আসলে চিকিৎসকরা তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন এবং পরে তাকে মারধর করা হয়। এই খবর হলে পৌঁছালে সাধারণ শিক্ষার্থীরা সেখানে জড়ো হন এবং তাদের ওপরও হামলা চালানো হয়। এই সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। আহতদের প্রাথমিক
চিকিৎসা দেওয়া হলেও পুরো হাসপাতাল এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
এই ঘটনার প্রতিবাদে এবং নিজেদের নিরাপত্তার দাবিতে তাৎক্ষণিকভাবে কর্মবিরতির ডাক দেন হাসপাতালের শিক্ষানবিশ (ইন্টার্ন) চিকিৎসকরা। তারা নিরাপত্তার অভাব বোধ করছেন জানিয়ে জরুরি বিভাগের ফটক বন্ধ করে দেন এবং সব ধরনের চিকিৎসাসেবা বন্ধ রাখেন।
এর ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে আসা গুরুতর অসুস্থ রোগীদের অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। হাসপাতালের বাইরে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে দেখা যায় মুমূর্ষু রোগীদের বহনকারী কয়েক ডজন অ্যাম্বুলেন্স। স্বজনদের আহাজারি আর আকুতি সত্ত্বেও জরুরি বিভাগের সেবা চালু না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় পুলিশ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক মো. ফারুক জানান, মূলত ওষুধ কেনাকে কেন্দ্র করেই এই অপ্রীতিকর ঘটনার সূত্রপাত। খবর পাওয়া মাত্রই অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালানো হয়েছে। সন্ধ্যা পর্যন্ত হাসপাতাল এলাকায় পুলিশি টহল জোরদার রাখা হয়েছে এবং উভয় পক্ষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এদিকে চিকিৎসক নেতারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, কর্মস্থলে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা কাজে ফিরবেন না।
তাদের দাবি, দায়িত্বরত অবস্থায় চিকিৎসকদের ওপর হামলার ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং এর সুষ্ঠু বিচার করতে হবে। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মধ্যে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিরসনে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত হাসপাতালের ভেতরে চিকিৎসকরা এবং বাইরে শিক্ষার্থীরা অবস্থান নিয়ে থাকায় থমথমে অবস্থা কাটেনি।
শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো দুটি মহান পেশার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের মধ্যে এমন সংঘর্ষ কেবল অনাকাঙ্ক্ষিতই নয়, বরং উদ্বেগের বিষয়। একটি ছোট ভুল বোঝাবুঝি বা ওষুধের দুষ্প্রাপ্যতা নিয়ে সৃষ্ট সংকট আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব ছিল। কিন্তু সহিংস পথ বেছে নেওয়ায় শেষ পর্যন্ত সাধারণ রোগীদের জীবন হুমকির মুখে পড়েছে। জনগণের করের টাকায় পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে শৃঙ্খলা ও ধৈর্য বজায় রাখা যেমন শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব, তেমনি সেবার মানসিকতা নিয়ে রোগীদের প্রতি সহনশীল হওয়া চিকিৎসকদের কর্তব্য। ভবিষ্যতে এ ধরনের সংঘাত এড়াতে হাসপাতালগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি উভয় প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনের মধ্যে দ্রুত সমন্বয় প্রয়োজন।