দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরাচারী শাসনের ফলে দেশের বিপর্যস্ত শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুনরায় গড়ে তোলার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন পাঠ্যক্রমের অধীনে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে বাস্তবমুখী ও যুগোপযোগী করার আহ্বান জানান।
রোববার দুপুরে আয়োজিত এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী দেশের চলমান উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার নানাবিধ সীমাবদ্ধতা এবং তা থেকে উত্তরণের দিকনির্দেশনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিগত দেড় দশকের বেশি সময়ের ফ্যাসিবাদী শাসন দেশের সব ধরনের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি শিক্ষা খাতকেও চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। একটি জাতির সামগ্রিক অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দেওয়ার সুদূরপ্রসারী চক্রান্তের অংশ হিসেবে শিক্ষাকে গুরুত্বহীন করে তোলা হয়েছিল। তবে বর্তমান গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে এখন আর পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই, আমাদের অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বিশ্বায়ন ও আধুনিক প্রযুক্তির তীব্র প্রতিযোগিতায় দেশের তরুণদের টিকে থাকার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, একটি আধুনিক জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন করতে না পারলে আমরা বিশ্বমঞ্চে পিছিয়ে পড়ব। দেশের বিশালসংখ্যক শিক্ষার্থী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে পড়ালেখা করছে। তাই এই উচ্চ শিক্ষালয়টিকে বাস্তবমুখী ও প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক শিক্ষার আলো বিস্তারে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে হবে। সনাতন পদ্ধতির পড়াশোনার গণ্ডি পেরিয়ে বৈশ্বিক কর্মবাজারের উপযোগী দক্ষ মানবসম্পদ গড়ার এখনই উপযুক্ত সময়।
উচ্চশিক্ষার যুগোপযোগী পাঠ্যসূচির ওপর আলোকপাত করে প্রধানমন্ত্রী বেশ কিছু আধুনিক প্রযুক্তিগত বিষয়ের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা [এআই] (কম্পিউটারের মানুষের মতো বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা), সাইবার নিরাপত্তা (তথ্যপ্রযুক্তির নিরাপত্তা ব্যবস্থা), কম্পিউটার প্রোগ্রামিং, ডিজিটাল মাধ্যমে উদ্যোক্তা উন্নয়ন, কার্যকর নেতৃত্ব এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার মতো প্রায়োগিক ও আচরণগত দক্ষতা (সফট স্কিল) ছাড়া বর্তমান সময়ের শিক্ষাক্রম পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না। এর পাশাপাশি আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নত ক্ষেত্র যেমন জিন প্রকৌশল (জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং), জৈবপ্রযুক্তি (বায়োটেকনোলজি), কোয়ান্টাম কম্পিউটিং (অত্যন্ত দ্রুত গণনা প্রযুক্তি), অতিসূক্ষ্ম প্রযুক্তি (ন্যানো প্রযুক্তি) এবং পঞ্চম প্রজন্মের মোবাইল নেটওয়ার্ক প্রযুক্তি (৫জি প্রযুক্তি)-র মতো যুগান্তকারী বিষয়গুলোকে আমাদের তরুণদের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এই প্রযুক্তিগুলোই আগামী দিনের আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ করবে।
দেশের অন্যতম বড় সংকট ‘শিক্ষিত বেকারত্ব’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, আমাদের তরুণদের মেধার কোনো ঘাটতি নেই। তবে পুঁথিগত বিদ্যা ও ব্যবহারিক দক্ষতার মধ্যে ব্যাপক অমিল থাকার কারণে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েও অনেকে উপযুক্ত কর্মসংস্থান পাচ্ছেন না। এই বাস্তবমুখী ব্যবধান ঘোচাতে সরকার ইতিমধ্যেই শিক্ষা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ বাস্তবমুখী, দক্ষতাভিত্তিক এবং কর্মমুখী করতে পরিকল্পিত কাজ শুরু করেছে। উচ্চশিক্ষাকে সরাসরি কর্মক্ষেত্রের সাথে যুক্ত করতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে দেশের বড় বড় শিল্প খাতের প্রাতিষ্ঠানিক মেলবন্ধন (ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া কানেকশন) স্থাপন বাধ্যতামূলক করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এর অংশ হিসেবে শিক্ষানবিশি কার্যক্রম (অ্যাপ্রেন্টিসশিপ) এবং ব্যবহারিক কর্মকালীন প্রশিক্ষণ (ইন্টার্নশিপ) চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোর কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে স্থানীয় বড় ব্যবসায়ী ও শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এই সংযোগ তৈরির কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে।
নতুন প্রজন্মকে কেবল চাকরিপ্রার্থী না বানিয়ে স্বাবলম্বী চাকরিদাতা হিসেবে গড়ে তোলার নতুন এক পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী ব্যবসায়িক চিন্তাভাবনাগুলোকে বাণিজ্যিকভাবে সফল করার লক্ষ্যে সরকার প্রতিযোগিতামূলক যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রাথমিক বীজ তহবিল (সিড ফান্ডিং) এবং উদ্ভাবনী বিশেষ অনুদান (ইনোভেশন গ্র্যান্ট) দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে তরুণ শিক্ষার্থীরা পড়ালেখা শেষ করার আগেই নতুন নতুন স্বনির্ভর উদ্যোগ গড়ে তোলার জন্য আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা লাভ করবে।
শিক্ষক সমাজকে সমাজ পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান রূপকার হিসেবে অভিহিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেকোনো দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য ও গুণগত মান নির্ভর করে শিক্ষকদের আন্তরিকতা, জ্ঞান, পেশাগত দক্ষতা ও নৈতিক অঙ্গীকারের ওপর। তাই শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সাথে তিনি তরুণ প্রজন্মকে প্রযুক্তির কুফল থেকে দূরে রাখতে আধুনিক শিক্ষার পাশাপাশি সামাজিক, নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধে সমৃদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা হাজারো কলেজের লাখ লাখ তরুণকে যদি শুধু পুঁথিগত বিদ্যার সনদ দেওয়ার বদলে আধুনিক প্রযুক্তির প্রায়োগিক শিক্ষায় দক্ষ করে তোলা যায়, তবে তা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক অভূতপূর্ব ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। প্রধানমন্ত্রীর এই বাস্তবধর্মী বক্তব্যে যে নতুন রূপরেখা উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। তবে এসব লক্ষ্য অর্জনে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে প্রতিটি কলেজ পর্যায়ে পর্যাপ্ত অবকাঠামো, গবেষণাগার ও আধুনিক প্রযুক্তির সরবরাহ দ্রুত নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তবেই দেশের শিক্ষিত তরুণসমাজ সত্যিকার অর্থে মানবসম্পদে রূপান্তরিত হতে পারবে।