আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশের শ্রমজীবী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে এবং উৎসবের আনন্দ ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে আগামী ২১ মের মধ্যে শ্রমিকদের বোনাস এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বেতন পরিশোধের চূড়ান্ত নির্দেশ দিয়েছে সরকার। বৃহস্পতিবার শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক উচ্চপর্যায়ের সভায় ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে শ্রমিকদের জন্য নৌ-পথে ভাড়ায় ছাড়সহ নানামুখী সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে।
রাজধানীর সিরড্যাপ (সমন্বিত পল্লী উন্নয়ন কর্মসূচি) আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বৃহস্পতিবার দুপুরে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় এই নির্দেশনা দেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। মূলত ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদ (সরকার, মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত সভা) এবং তৈরি পোশাক শিল্প বিষয়ক বিশেষ পরামর্শ পরিষদের এই সভায় পোশাক খাতসহ দেশের সামগ্রিক শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা ও শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুর রহমান তরফদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, আগামী ২১ মের মধ্যে সব শিল্প কারখানায় শ্রমিকদের ঈদ বোনাস বা উৎসব ভাতা আবশ্যিকভাবে পরিশোধ করতে হবে। একই সাথে চলতি মাসের বেতনও নির্ধারিত তারিখের মধ্যে পরিশোধের জন্য মালিকপক্ষকে নির্দেশ দেন তিনি। মন্ত্রী বলেন, "শ্রমিকরা আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। তাদের শ্রম ও ঘামে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। তাই পবিত্র ঈদের আনন্দ থেকে যেন কোনো শ্রমিক বঞ্চিত না হয়, সেটি নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব।"
সভায় উপস্থিত শ্রমিক নেতারা সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও কিছু কিছু কারখানায় পূর্বের বকেয়া বেতন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তারা দাবি করেন, কেবল বোনাস নয়, বরং যাদের গত কয়েক মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে, তাদের পাওনা পরিশোধে যেন সরকার দ্রুত হস্তক্ষেপ করে। নেতারা আশ্বাস দেন যে, যদি সময়মতো বেতন ও বোনাস পরিশোধ করা হয়, তবে শিল্পাঞ্চলে কোনো ধরনের অসন্তোষ বা আন্দোলনের আশঙ্কা থাকবে না। এছাড়া শ্রমিকদের ঈদযাত্রা নিরাপদ ও যানজটমুক্ত করতে সরকারের কাছে বিশেষ বাস, ট্রেন ও লঞ্চের ব্যবস্থার অনুরোধ জানান তারা।
শ্রমিকদের বাড়ি ফেরার পথ সুগম করতে সরকার এবার বিশেষ কৌশল অবলম্বন করছে বলে জানান শ্রমমন্ত্রী। তিনি জানান, একই সময়ে সব কারখানা ছুটি দিলে সড়কে ও পরিবহনে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়। এই সংকট এড়াতে এবং অসহনীয় যানজট কমাতে মালিক ও শ্রমিক পক্ষের সাথে সমঝোতার ভিত্তিতে অঞ্চলভেদে পর্যায়ক্রমে বা ধাপে ধাপে কারখানাগুলো ছুটি দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এতে করে শ্রমিকরা নির্বিঘ্নে বাড়ি ফিরতে পারবেন এবং সড়ক ও জনপথের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়বে না।
পরিবহন খাতের স্বস্তির খবর হিসেবে সভায় নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি একটি বিশেষ ঘোষণা দেন। তিনি জানান, ঈদ উপলক্ষে শ্রমিকদের যাতায়াত খরচ কিছুটা কমাতে সব রুটে জাহাজ ও লঞ্চের ভাড়া ১০ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটি নিম্ন আয়ের শ্রমিকদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক স্বস্তি বয়ে আনবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা এবং পাওনা পরিশোধ নিয়ে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়াতে স্থানীয় প্রশাসন, জেলা পুলিশ এবং বিশেষ করে শিল্প পুলিশকে (কারখানা ও শিল্প এলাকার নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশ বাহিনী) সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা সভায় নিশ্চিত করেছেন যে, যে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সব সময় প্রস্তুত থাকবে।
সভায় অন্যদের মধ্যে বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (মালিকদের সংগঠন) সভাপতি ফজলে শামীম এহসান এবং জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনসহ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তারা সবাই একমত পোষণ করেন যে, শিল্প রক্ষা এবং শ্রমিক স্বার্থ সংরক্ষণে মালিক-শ্রমিক সুসম্পর্ক বজায় রাখা এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি।
সরকারের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে প্রতি বছরই দেখা যায়, কিছু কারখানা শেষ মুহূর্তে পাওনা পরিশোধ না করে শ্রমিকদের রাস্তায় নামতে বাধ্য করে। এবার যেন তার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য জেলা প্রশাসন ও শিল্প পুলিশকে কঠোর নজরদারি চালাতে হবে। বিশেষ করে যারা বকেয়া বেতন নিয়ে টালবাহানা করে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। আবার লঞ্চ ভাড়ায় ১০ শতাংশ ছাড়ের যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, তার সুফল যেন প্রকৃত শ্রমিকরা পান এবং মাঝপথে যেন বাড়তি ভাড়া আদায়ের ভোগান্তি না হয়, সেটি নিশ্চিত করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ঈদ কেবল ধনীদের জন্য নয়, বরং এই উৎসব যেন কারখানার সাধারণ শ্রমিকের ঘরেও অনাবিল আনন্দ নিয়ে আসে, সেটিই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।