মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে রাজধানী ঢাকা, মৌলভীবাজার, পটুয়াখালী ও বগুড়াসহ দেশের বেশ কয়েকটি স্থানে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হয়েছে। বুধবার (২৭ মে) সকালে এসব এলাকায় পৃথকভাবে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে নারী-পুরুষসহ সব বয়সী ধর্মপ্রাণ মানুষ ত্যাগের এই মহিমায় শামিল হন।
কোরবানির ঈদ বা পবিত্র ঈদুল আজহা মূলত আত্মত্যাগ ও মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি নিবেদনের উৎসব। রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলাদেশে যেদিন ঈদ উদযাপনের দিন ধার্য করা হয়, তার একদিন আগেই দেশের কিছু নির্দিষ্ট স্থানে ঈদ উদযাপনের একটি রেওয়াজ বেশ কয়েক বছর ধরেই চলে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় এবারও সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের সঙ্গে একই দিনে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে।
রাজধানীর পান্থপথে অবস্থিত সামুরাই সম্মেলন কেন্দ্রে বুধবার সকাল সাড়ে সাতটায় ঈদের একটি বড় জামাত অনুষ্ঠিত হয়। ‘মুসলিম উম্মাহ বাংলাদেশ’ নামের একটি ধর্মীয় সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত এই জামাতে অংশ নেন রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা কয়েকশ ধর্মপ্রাণ মুসল্লি। অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে নামাজ আদায় শেষে তারা পরস্পরের সঙ্গে কোলাকুলি করে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেন।
অন্যদিকে, চায়ের দেশ খ্যাত মৌলভীবাজার শহরের সরকারি বিশ্রামাগার সংলগ্ন এলাকায় দীর্ঘ পনেরো বছরের ঐতিহ্য মেনে এবারও সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে আগাম ঈদ উদযাপন করেছেন স্থানীয় কিছু মানুষ। সকাল সাড়ে সাতটায় অনুষ্ঠিত এই ঈদের জামাতে এলাকার শতাধিক নারী ও পুরুষ অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে অংশ নেন। জামাতে ইমামতি করেন স্থানীয় আলেম আবদুল মাওফিক চৌধুরী। নামাজ শেষে নির্ধারিত খুতবা (ধর্মীয় বয়ান) পাঠ করা হয়। এরপর দেশ, জাতি এবং সমগ্র বিশ্ব মুসলিম সম্প্রদায়ের সার্বিক শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়।
উত্তরাঞ্চলের জেলা বগুড়াতেও একই চিত্র দেখা গেছে। জেলার গাবতলী উপজেলায় অবস্থিত রেলওয়ে জামে মসজিদে সকাল সাড়ে সাতটার দিকে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। বৈরী আবহাওয়া ও টানা বৃষ্টির কারণে এবার খোলা মাঠের পরিবর্তে মসজিদের ভেতরেই ঈদের জামাতের আয়োজন করতে হয়। এই জামাতে ইমামতি করেন মাওলানা মিজানুর রহমান। গাবতলী ছাড়াও পাশের কাহালু ও ধুনট উপজেলা থেকে আসা অর্ধশতাধিক মুসল্লি এতে অংশ নেন। পুরুষদের পাশাপাশি নারী ও শিশুরাও এই জামাতে শরিক হন।
আয়োজকরা জানান, বৃষ্টির কারণে রাস্তাঘাট কর্দমাক্ত থাকায় ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেকে দূর থেকে এসে জামাতে অংশ নিতে পারেননি। স্থানীয়রা জানান, গাবতলীতে সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে আগাম ঈদ উদযাপনের এই ঘটনা এবার নিয়ে টানা চতুর্থবারের মতো ঘটল। নামাজ শেষে মুসল্লিরা একে অপরের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেন।
এছাড়া দক্ষিণের উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালীর প্রায় পঁয়ত্রিশটি গ্রামের অন্তত পঁচিশ হাজার মানুষ বুধবার উৎসবমুখর পরিবেশে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপন করেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
এই আগাম ঈদ উদযাপনের পেছনে আয়োজক ও অংশগ্রহণকারীদের মূল যুক্তি হলো, পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে নতুন চাঁদ দেখা গেলে সমগ্র মুসলিম বিশ্বের উচিত সেই অনুযায়ী রোজা ও ঈদ পালন করা। ভৌগোলিক সীমানার চেয়ে তারা চাঁদের উপস্থিতিকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। সেই ধর্মীয় বিশ্বাস থেকেই তারা সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে মিল রেখে একদিন আগেই ঈদ উদযাপন করে আসছেন।
এদিকে, দেশের প্রচলিত নিয়মের বাইরে গিয়ে একদিন আগে ঈদ আয়োজনের কারণে কোথাও যেন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বা বিশৃঙ্খলা তৈরি না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর রেখেছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গাবতলী আদর্শ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রাকিব হোসেন গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, প্রশাসনের সতর্ক অবস্থানের কারণে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশেই আগাম ঈদের সকল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে।
বিশ্বের যেকোনো স্থানে চাঁদ দেখা যাওয়ার ওপর ভিত্তি করে একই দিনে ঈদ বা রোজা পালন করার বিষয়টি নিয়ে আমাদের সমাজে দীর্ঘদিন ধরেই পক্ষে-বিপক্ষে নানা আলোচনা রয়েছে। একটি পক্ষের দাবি, ভৌগোলিক সীমানা ভুলে সমগ্র মুসলিম বিশ্বের উচিত একই দিনে উৎসব পালন করা। অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় নিয়ম ও দেশের মূলধারার আলেম সমাজের মতে, নিজ নিজ ভৌগোলিক সীমানায় চাঁদ দেখার ওপরই নির্ভর করে এসব ধর্মীয় উৎসবের দিনক্ষণ। তবে মতপার্থক্য যা-ই থাকুক না কেন, উৎসবের দিনটিতে কোনো প্রকার সংঘাত বা বিশৃঙ্খলা না জড়িয়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতি বজায় রাখাটাই একটি সভ্য সমাজের লক্ষণ। ত্যাগের উৎসব ঈদুল আজহার মূল শিক্ষাও কিন্তু এটাই—সব ভেদাভেদ ভুলে একে অপরের প্রতি সহমর্মী হওয়া এবং সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় করা।