রাজধানীর বিভিন্ন সাংবাদিকের কাছ থেকে পুলিশের বিশেষ শাখার পরিচয় দিয়ে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক তথ্য চাওয়ার ঘটনায় গণমাধ্যমকর্মীদের মাঝে ব্যাপক উদ্বেগ ও আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, এটি তাদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা কেন্দ্রীয় উদ্যোগ নয়।
সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকজন সাংবাদিকের সাথে যোগাযোগ করে পুলিশের বিশেষ শাখার (সিটি এসবির) সদস্য পরিচয়ে বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে। ভুক্তভোগী সাংবাদিকদের অভিযোগ, তাদের কাছে জাতীয় পরিচয়পত্র, বিদ্যুৎ বিলের কপি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আইডি, পারিবারিক তথ্য এমনকি রাজনৈতিক মতাদর্শ সম্পর্কেও জানতে চাওয়া হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের বাসায় এসে এসব তথ্য সংগ্রহের ঘটনাও ঘটেছে। এ ধরনের তথ্য সংগ্রহের একটি ফরমও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যা গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে শঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ভুক্তভোগী সাংবাদিকদের দেওয়া তথ্যমতে, বিশেষ করে বিগত সরকারের আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত বা বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকদের সাথে এ ধরনের যোগাযোগ বেশি করা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক জানান, তার সহকর্মীদের অনেককে ফোনে এবং সরাসরি ডেকে তথ্য চাওয়া হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের আচরণ মার্জিত হলেও অনেকের সাথেই রূঢ় আচরণের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে পুলিশের বিশেষ শাখার অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক সরদার নুরুল আমিন বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে সদর দপ্তর আনুষ্ঠানিকভাবে অবগত নয়। তিনি বলেন, সাংবাদিকদের কাছ থেকেই তিনি প্রথম বিষয়টি জেনেছেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে তা যাচাই করার নির্দেশ দিয়েছেন। কোনো কেন্দ্রীয় নির্দেশনা ছাড়াই ব্যক্তিগত উদ্যোগে কেউ এমনটি করে থাকতে পারে বলে তিনি ধারণা করছেন।
সাংবাদিকদের শীর্ষ সংগঠন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আবু সালেহ আকন জানান, তিনিও এমন ফোন পাওয়ার পর পুলিশের উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ করেছিলেন। তিনি বলেন, পুলিশের বিশেষ শাখার প্রধান তাকে জানিয়েছেন যে তিনি এ বিষয়ে কিছু জানেন না। একই সাথে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের সাথেও তার কথা হয়েছে, তারাও এ বিষয়ে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রয়েছেন। এ অবস্থায় সাংবাদিকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি দপ্তরের পরিচয় দিয়ে কারা এসব কার্যক্রম চালাচ্ছে?
আবু সালেহ আকনের ধারণা, সরকারকে অস্থিতিশীল ও বেকায়দায় ফেলার জন্য কোনো স্বার্থান্বেষী মহল বা সরকারের ভেতরেই লুকিয়ে থাকা কোনো গোষ্ঠী এ ধরনের বিভ্রান্তিকর কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে।
উল্লেখ্য, জুলাই-আগস্টের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে দেশে সাংবাদিকতা পেশা ও গণমাধ্যমকর্মীরা এক নাজুক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যে অসংখ্য সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যাসহ নানা মামলা দায়ের করা হয়েছে, অনেকে কারাগারে আছেন, আবার অনেকের বিরুদ্ধে বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এমন অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যে সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহের এই নতুন উদ্যোগটি পেশাগত নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহের বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত গোপনীয়তার লঙ্ঘনই নয়, বরং এটি স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর পরোক্ষ চাপ সৃষ্টির একটি কৌশল হতে পারে। যদি এটি প্রাতিষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত না হয়ে থাকে, তবে পুলিশের পরিচয় ব্যবহারকারী এই অদৃশ্য চক্রটিকে খুঁজে বের করা জরুরি। অন্যথায়, এই ধোঁয়াশা সাংবাদিকদের মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর অবিশ্বাসের জন্ম দেবে এবং গণতান্ত্রিক সমাজে সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে আরও সংকুচিত করবে।