দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, সীমান্ত সুরক্ষায় বাড়তি সতর্কতা এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ প্রতিরোধে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের সীমান্তবর্তী ১১টি স্পর্শকাতর জেলায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর পাশাপাশি বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে।
সোমবার (৮ জুন) বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদর দপ্তর থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। বাহিনীর উপ-পরিচালক (গণসংযোগ) মো. আশিকউজ্জামান স্বাক্ষরিত ওই বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা জোরদার করার অংশ হিসেবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তির তথ্য অনুযায়ী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মধ্যে ২০২৫ সালে স্বাক্ষরিত একটি দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারকের (সহযোগিতা চুক্তি) আওতায় সীমান্ত এলাকায় এই অতিরিক্ত বাহিনী যুক্ত করা হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও দেশের নিরাপত্তা কার্যক্রমকে আরও বেশি সমন্বিত, সুশৃঙ্খল এবং কার্যকর করে তোলা। রাষ্ট্রীয় বর্তমান প্রয়োজন ও সামগ্রিক নিরাপত্তার চাহিদাকে প্রাধান্য দিয়ে আনসার ও ভিডিপি সদস্যরা বিজিবির সঙ্গে নিবিড় সমন্বয়ের মাধ্যমে সীমান্ত সুরক্ষায় তাদের অর্পিত দায়িত্ব পালন করছেন।
বর্তমানে দেশের সীমান্তবর্তী মোট ১১টি জেলাকে এই বিশেষ নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় আনা হয়েছে। জেলাগুলো হলো— চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, জয়পুরহাট, যশোর, ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, সিলেট, জামালপুর এবং পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি। এসব জেলার উপজেলা ও থানা পর্যায়ে কর্মরত আনসার সদস্যসহ গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী (ভিডিপি) এবং শহর প্রতিরক্ষা বাহিনী (টিডিপি)-র সদস্যদের সরাসরি মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনের জন্য মোতায়েন করা হয়েছে।
নিয়মিত মোতায়েনকৃত এই জনবলের পাশাপাশি যেকোনো ধরণের জরুরি ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত সাড়া দেওয়ার প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত অতিরিক্ত জনবল সরবরাহ করার লক্ষ্যে বিশেষায়িত ‘আনসার ব্যাটালিয়ন’ এর সদস্যদের সার্বক্ষণিক প্রস্তুত ও সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। সীমান্ত এলাকার পরিস্থিতি বিবেচনায় তাদের যেকোনো মুহূর্তে মূল কার্যক্রমে যুক্ত করা হতে পারে।
সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে প্রায়শই অনুপ্রবেশ, চোরাচালান, মাদক পাচার এবং অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত অপরাধের মতো চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি হতে হয়। বিভিন্ন সময়ে দেশের সীমান্ত সংলগ্ন কুড়িগ্রাম, পঞ্চগড় কিংবা যশোর অঞ্চল দিয়ে জোরপূর্বক পুশ-ইন (সীমান্ত পেরিয়ে পুশ-ইন বা অবৈধভাবে মানুষ পাঠানোর চেষ্টা) করার মতো ঘটনাও ঘটে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে সীমান্তে বিজিবির পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা এবং সাধারণ মানুষের সাথে সম্পৃক্ত আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের সম্পৃক্ততা অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
আনসার ও ভিডিপি বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই যৌথ সমন্বয়ের ফলে দেশের জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামো আরও বেশি সুদৃঢ় হবে। বিজিবির মূল কার্যক্রমের পাশাপাশি তাদের এই সহায়ক ভূমিকা সীমান্ত সুরক্ষায় একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করবে। স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তঃসীমান্ত অপরাধ ও চোরাচালান প্রতিরোধে একটি টেকসই, দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
সীমান্তের নিরাপত্তা কেবল কাঁটাতারের বেড়া বা সশস্ত্র পাহারার ওপর নির্ভর করে না, বরং এর সঙ্গে সীমান্ত অঞ্চলের জনগণের সম্পৃক্ততা ও আস্থা জড়িয়ে থাকে। আনসার ও ভিডিপির মতো একটি বৃহৎ এবং তৃণমূল পর্যায়ে বিস্তৃত বাহিনীকে সীমান্ত সুরক্ষায় যুক্ত করার সিদ্ধান্তটি নিঃসন্দেহে দূরদর্শী। স্থানীয় ভূখণ্ড এবং অধিবাসীদের সাথে এই বাহিনীর নিবিড় যোগাযোগ থাকার কারণে তা সীমান্ত নজরদারির ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে এই যৌথ কার্যক্রমের সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ে বিজিবি ও আনসার বাহিনীর মধ্যকার পারস্পরিক পেশাদারিত্ব, সঠিক তথ্য আদান-প্রদান এবং সমন্বয়ের ওপর। দেশের সামগ্রিক সার্বভৌমত্ব রক্ষার স্বার্থে এই যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা ফলপ্রসূ হয়, তা ভবিষ্যৎ সীমান্ত ব্যবস্থাপনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হবে।