দেশের লক্ষ লক্ষ সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে নতুন বেতন কাঠামো বা নবম পে স্কেল নিয়ে তোড়জোড় শুরু করেছে সরকার। বর্তমান বাজার পরিস্থিতি এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের সঙ্গে সংগতি রেখে আগামী ২০২৬ সালেই এই নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো ঘোষণার জোর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
স্বাধীন বাংলাদেশে সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান উন্নয়ন ও কর্মস্পৃহা বজায় রাখতে বিভিন্ন সময়ে জাতীয় বেতন কাঠামো ঘোষণা করা হয়েছে। ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম বেতন কাঠামো প্রবর্তনের পর থেকে এ পর্যন্ত মোট আটটি পে স্কেল বা বেতন কাঠামো ঘোষণা করেছে সরকার। সর্বশেষ ২০১৫ সালে অষ্টম পে স্কেল কার্যকর করা হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি পাঁচ বছর অন্তর নতুন বেতন কাঠামো আসার কথা থাকলেও বৈশ্বিক করোনা অতিমারি এবং বিশ্বজুড়ে চলমান অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে এই প্রক্রিয়াটি বেশ দীর্ঘায়িত হয়েছে। প্রায় এক দশকের কাছাকাছি সময় পার হওয়ার পর এখন নতুন করে নবম পে স্কেল নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে নড়াচড়া শুরু হয়েছে।
সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬ সালের শুরু থেকেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এই নতুন কাঠামো নিয়ে ব্যাপক কৌতূহল ও আশার সঞ্চার হয়েছে। বর্তমানে সরকারের নীতি-নির্ধারণী মহলে প্রস্তাবিত এই বেতন কাঠামোর বিভিন্ন দিক নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য ১০ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই উচ্চপদস্থ কমিটি দেশের বর্তমান মুদ্রাস্ফীতি (পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া ও টাকার মান কমে যাওয়া) এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনা করে সুপারিশগুলো যাচাই-বাছাই করছে।
প্রস্তাবিত নবম জাতীয় বেতন কাঠামো বা পে স্কেলে বিভিন্ন ধাপে বা গ্রেডে (বেতন নির্ধারণের স্তর) বেতনের যে খসড়া তালিকাটি নিয়ে আলোচনা চলছে, তা সাধারণ কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম ধাপ বা ১ নম্বর গ্রেডের বেতন ধরা হয়েছে নির্ধারিত ১ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা। একইভাবে দ্বিতীয় ধাপের বেতন ১ লক্ষ ৩২ হাজার থেকে শুরু করে ১ লক্ষ ৫৩ হাজার টাকা পর্যন্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। মধ্যম সারির ধাপগুলোতেও বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। যেমন—১০ নম্বর ধাপের বেতন বর্তমানে যা আছে, সেখান থেকে বাড়িয়ে ৩২ হাজার টাকা থেকে ৭৭ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তৃণমূল পর্যায়ের কর্মচারীদের অর্থাৎ ২০ নম্বর ধাপের বেতন ২০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৪৮ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণের একটি রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। অন্যান্য ধাপগুলোর ক্ষেত্রেও আনুপাতিক হারে বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব রাখা হয়েছে যা সরকারি কর্মচারীদের বর্তমান অর্থনৈতিক চাপ থেকে মুক্তি দিতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বারবার সতর্ক করে দিয়ে বলছে যে, এই তালিকাটি এখনো প্রাথমিক আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা দপ্তর থেকে চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন (সরকারি লিখিত আদেশ) বা গেজেট প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত এটিকে চূড়ান্ত বলে গণ্য করার সুযোগ নেই।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, নতুন এই বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা সরকারের জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ হবে। একদিকে ক্রমবর্ধমান দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা এবং অন্যদিকে কয়েক লক্ষ কর্মচারীর বেতন বৃদ্ধির জন্য বিশাল বাজেটের সংস্থান করা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা বেশ কঠিন। বিশেষ করে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখার পাশাপাশি পরিচালন ব্যয় বা বেতন-ভাতা খাতে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া জাতীয় অর্থনীতির ওপর বড় ধরণের চাপ তৈরি করতে পারে। তবে সরকারি কর্মচারীরা বলছেন, বর্তমান বাজারে সামান্য বেতনে সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাই জীবন বাঁচানোর তাগিদেই এই বেতন বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি।
বেতন বৃদ্ধি কেবল সরকারি কর্মচারীদের ব্যক্তিগত লাভ নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক ক্রয়ক্ষমতা ও বাজারে চাহিদাও বৃদ্ধি করে। তবে মুদ্রাস্ফীতির এই সময়ে বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি যদি বাজার নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে এই বাড়তি অর্থ কর্মচারীদের হাতে আসার আগেই পণ্যের দামের কারণে মূল্যহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। সরকারকে এমন একটি কৌশল গ্রহণ করতে হবে যাতে কর্মচারীরা প্রকৃত সুফল পান এবং জাতীয় অর্থনীতিতেও কোনো বিপর্যয় না ঘটে। একটি বৈষম্যহীন ও যুগোপযোগী বেতন কাঠামো কেবল কর্মস্পৃহা বাড়াবে না, বরং প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা আনতেও সহায়ক হবে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, কেবল বেতন বৃদ্ধিই নয়, বরং সরকারি সেবার মান বাড়াতেও সংশ্লিষ্ট সকলে সমান সচেষ্ট হবেন।