দেশের হাওর অঞ্চলের ধান চাষিদের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এখন থেকে ১০ দিন আগেই ঘরে তোলা যাবে—এমন আগাম জাতের ধান উদ্ভাবনের কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।
শনিবার দুপুরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে মৎস্য অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সব দপ্তর ও সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ তথ্য জানান।
কৃষিমন্ত্রী বলেন, "আমাদের চাহিদার তুলনায় আবাদি জমির পরিমাণ অপ্রতুল হলেও সুখের বিষয় হচ্ছে, ক্রমাগতভাবে আমাদের ধানের উৎপাদন বাড়ছে। দেশের হাওর অঞ্চলগুলোকে ধান উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্রস্থল (হাব) বলা চলে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, ধান পাকার শেষ মুহূর্তে আকস্মিক অতিবৃষ্টি ও বন্যায় কৃষকেরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হন। এই ক্ষয়ক্ষতি এড়াতেই আমরা ধানের বয়স ১০ দিন কমিয়ে আনার জন্য নতুন জাত উদ্ভাবনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। বৃষ্টি শুরু হওয়ার সপ্তাহখানেক আগে যদি ফসল ঘরে তোলা (হারভেস্ট) সম্ভব হয়, তবে হাওরের কৃষকেরা লোকসানের হাত থেকে রক্ষা পাবেন।"
পানিতে নিমজ্জিত ফসল কাটার আধুনিক প্রযুক্তির বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, কোনো কারণে যদি হাওরের জমি তলিয়েও যায়, তবে পানিতে ডুবে থাকা ধান অনায়াসে কেটে আনা যায়—বিশ্বজুড়ে এমন আধুনিক ফসল কাটার যন্ত্র (হারভেস্টিং মেশিন) সন্ধান ও আমদানির চেষ্টা চলছে।
জাতীয় মাছ ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং জেলেদের জীবনমান উন্নয়ন নিয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, জাটকা (ছোট ইলিশ) নিধন বন্ধ করতে এবার প্রজনন মৌসুমে জেলেদের তালিকা তৈরি করে পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা দেওয়া হয়েছে। জেলেরা যাতে দীর্ঘমেয়াদে রেনু বা পোনা মাছ না ধরেন, সে লক্ষ্যে তাঁদের বিকল্প কর্মসংস্থানের প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে।
জেলেদের অর্থনৈতিক দুর্দশার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "আমাদের মৎস্যজীবী জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ স্থানীয় দাদনদারদের (সুদখোর মহাজন) ওপর নির্ভরশীল। তাঁদের যদি এই ঋণজাল থেকে মুক্ত করে বিকল্প উপার্জনের ব্যবস্থা করে দেওয়া যায়, তবে জাটকা নিধন স্থায়ীভাবে বন্ধ হবে এবং ইলিশের উৎপাদন বহুগুণ বাড়বে। আমাদের লক্ষ্য কেবল স্থানীয় বাজারেই ইলিশ সহজলভ্য করা নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাজারেও এর সঠিক বাজারজাতকরণ (মার্কেটিং) করা। সঠিকভাবে উৎপাদন ও বিপণন করা গেলে বৈশ্বিক বাজারে জনপ্রিয় টুনা মাছের পরেই জায়গা করে নেবে বাংলাদেশের ইলিশ।"
নদীর নাব্য সংকট দূর করতে ড্রেজিং বা নদীখনন প্রকল্প হাতে নেওয়ার কথা জানিয়ে মন্ত্রী আরও বলেন, নদী পাহারা দেওয়ার জন্য উপকূলীয় রক্ষীবাহিনীর (কোস্টগার্ড) জনবল বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কৃষিপণ্য সুরক্ষায় সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, কৃষকদের মধ্যস্বত্বভোগীদের (দালাল বা ফড়িয়া) হাত থেকে রক্ষা করতে এবং পরিবহন খরচ বাঁচাতে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি বা দুটি করে ক্ষুদ্র হিমাগার (মিনি কোল্ড স্টোরেজ) নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে কৃষকেরা সরাসরি ন্যায্যমূল্যে তাঁদের উৎপাদিত ফসল বিক্রি করতে পারবেন। এ ছাড়াও, ইউনিয়নভিত্তিক একই দিনে সরকারিভাবে ধান কেনার নতুন পদ্ধতি চালুর বিষয়েও সরকার সক্রিয়ভাবে চিন্তাভাবনা করছে।