Logo
ট্রেন্ডিং: হামে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত সহস্রাধিক যুবলীগ চেয়ারম্যান পরশ ও স্ত্রীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশ আর কখনও কারও কাছে মাথা নত করবে না: সংসদে খলিলুর নেপাল সীমান্তে প্রলয়ঙ্করী বন্যা: নিহত ৩৩০, নিখোঁজ সহস্রাধিক

হাতের মুঠোয় ভূমি সেবা: নামজারি ও খাজনা পরিশোধে ঘুচেছে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি

Roksana
29 August 2026, 02:11 AM পড়তে ১ মিনিট
হাতের মুঠোয় ভূমি সেবা: নামজারি ও খাজনা পরিশোধে ঘুচেছে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি

একসময় জমির খাজনা দেওয়া বা নামজারি করা মানেই ছিল দিনের পর দিন সরকারি দপ্তরে ঘোরাঘুরি আর দালালদের দৌরাত্ম্য সহ্য করা। তবে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় সেই হতাশার চিত্র এখন অতীত। বর্তমানে মুঠোফোনের মাধ্যমেই ঘরে বসে মিলছে ভূমি সংক্রান্ত নানা সেবা, যার ফলে একদিকে যেমন কমছে দুর্নীতি, অন্যদিকে নাগরিক জীবনে ফিরেছে স্বস্তি।


ভূমি কার্যালয় বা জেলা প্রশাসকের দপ্তরে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত সেবার জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করার দিন ফুরিয়ে আসছে। সেবাপ্রত্যাশীদের দীর্ঘশ্বাস, তথ্যের অস্বচ্ছতা এবং মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালদের হয়রানি একসময় দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু সরকারের প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার উদ্যোগের ফলে ভূমি মন্ত্রণালয় এবং ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর পুরো ব্যবস্থাকে ধাপে ধাপে ডিজিটাল বা তথ্যপ্রযুক্তির আওতায় নিয়ে এসেছে।

এখন মুঠোফোন বা কম্পিউটারের সাহায্যে অন্তর্জাল (ইন্টারনেট) ব্যবহার করে খুব সহজেই জমির খতিয়ান তোলা, নামজারি (মালিকানা পরিবর্তন বা মিউটেশন) করা এবং ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) দেওয়া যাচ্ছে।

ঘরে বসেই খাজনা পরিশোধের স্বস্তি
আগে ভূমি উন্নয়ন কর দিতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হতো, নষ্ট হতো মূল্যবান সময় ও অর্থ। কখনো কখনো এক কাজের জন্য বারবার ঘুরতে হতো। এখন মুঠোফোনে আর্থিক সেবার মাধ্যমে ঘরে বসেই এই কর দেওয়া যাচ্ছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ডিজিটাল পদ্ধতিতে সেবা চালুর পর থেকে প্রতিবছরই করদাতার সংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে বছরে প্রায় চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ লাখ মানুষ ডিজিটাল মাধ্যমে খাজনা দিচ্ছেন। এমনকি প্রবাসী বাংলাদেশিরাও বিদেশে বসে নিজেদের জমির কর পরিশোধ করতে পারছেন। ফলে সরাসরি ভূমি কার্যালয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমে গেছে।

লক্ষ্মীপুরের সদর উপজেলার বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, আগে খাজনা দিতে পুরো একটি দিন পার হয়ে যেত। এখন মুঠোফোনে কয়েক মিনিটেই কাজ শেষ হয় এবং সাথে সাথেই রসিদ পাওয়া যায়।

নামজারিতে দালালদের দৌরাত্ম্য হ্রাস
জমি কেনাবেচার পর সবচেয়ে বড় ঝামেলার কাজ ছিল নামজারি করা। সাধারণ মানুষ জটিল নিয়মের বেড়াজালে আটকে বাধ্য হয়ে দালালদের দ্বারস্থ হতেন এবং সরকারি নির্ধারিত ফি-এর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি টাকা খোয়াতেন। এখন আবেদনকারী নিজেই ডিজিটাল মাধ্যমে আবেদন করতে পারছেন এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যুক্ত করতে পারছেন। প্রতিটি ধাপে মুঠোফোনে খুদে বার্তার (এসএমএস) মাধ্যমে কাজের অগ্রগতি জানা যাচ্ছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশে এ পর্যন্ত এক কোটির বেশি ডিজিটাল নামজারি নিষ্পত্তি হয়েছে। বর্তমানে আরও প্রায় পাঁচ লাখ আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে।

এ বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (মাঠ প্রশাসন অনুবিভাগ) নাসরিন জাহান জানান, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার সেবাপ্রত্যাশীদের সমস্যা অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে। আটকে থাকা আবেদনগুলো যেন দ্রুত শেষ করা হয়, সে বিষয়ে উপজেলা পর্যায়ের সহকারী কমিশনারদের (ভূমি) কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ করতে না পারলে তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে বলেও তিনি নিশ্চিত করেন। চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার শিক্ষক শাহাদাত হোসেন বলেন, আগে ভাবতাম নামজারি করা খুব কঠিন কাজ। কিন্তু এবার নিজে আবেদন করে কোনো দালালের সাহায্য ছাড়াই কাজ শেষ করেছি।

খতিয়ান ও মানচিত্র যাচাইয়ে স্বচ্ছতা
 

আগে ভুয়া কাগজপত্রের কারণে জমি কিনতে গিয়ে অনেকেই প্রতারণার শিকার হতেন। এখন ডিজিটাল মাধ্যমেই জমির মালিকানা, দাগ নম্বর এবং খতিয়ান যাচাই করা যাচ্ছে। চট্টগ্রামের এক ব্যবসায়ী শিমুল চক্রবর্তী জানান, আগে জমির কাগজ যাচাই করা অনেক ঝামেলার ছিল। এখন খুব সহজেই মিলিয়ে দেখা যায় তথ্য সঠিক কি না।

তথ্যভান্ডার সংরক্ষণ ও ভবিষ্যতের রূপরেখা
ভূমি মন্ত্রণালয় দেশের সব জমির তথ্য, খতিয়ান ও মানচিত্র নিয়ে একটি সমন্বিত তথ্যভান্ডার (ডাটাবেজ) তৈরি করছে। পুরোনো কাগজের রেকর্ড স্ক্যান করে ডিজিটাল মাধ্যমে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) এমদাদুল হক চৌধুরী বলেন, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার কারণে মানুষকে আর সরাসরি ভূমি কার্যালয়ে যেতে হচ্ছে না, এতে দুর্নীতি কমেছে। তবে দালালদের দৌরাত্ম্য পুরোপুরি বন্ধ করতে সাধারণ মানুষকে আরও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

ভবিষ্যতে ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থা (জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম বা জিআইএস) এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের মাধ্যমে মানচিত্রভিত্তিক জমির তথ্য দেখার সুবিধা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। ভূমি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব তোফাজ্জল হোসেন জানান, এই প্রযুক্তি চালু হলে জমির সীমানা নিয়ে বিরোধ ও মামলা অনেক কমে যাবে। এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে জাল কাগজপত্র শনাক্ত করা এবং একই জমি একাধিকবার বিক্রির চেষ্টা ঠেকানোও সহজ হবে।


ভূমি সেবায় তথ্যপ্রযুক্তির এই ব্যবহার দেশের সাধারণ মানুষের জন্য এক যুগান্তকারী পরিবর্তন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা হয়রানি, দীর্ঘসূত্রতা ও দুর্নীতির শেকড় উপড়ে ফেলতে এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, এখনো দেশের প্রান্তিক ও স্বল্পশিক্ষিত একটি বড় জনগোষ্ঠী প্রযুক্তি ব্যবহারে ততটা পারদর্শী নন। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অসাধু চক্র যেন নতুন কোনো উপায়ে প্রতারণার ফাঁদ পাততে না পারে, সেদিকে কর্তৃপক্ষের কড়া নজরদারি প্রয়োজন। প্রযুক্তি কেবল একটি মাধ্যম; একে দুর্নীতিমুক্ত ও জনবান্ধব রাখতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সততা এবং সাধারণ মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।

পরবর্তী খবর লোড হচ্ছে...
জাতীয়

হাতের মুঠোয় ভূমি সেবা: নামজারি ও খাজনা পরিশোধে ঘুচেছে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি

R
Roksana | 11 May 2026
বিস্তারিত পড়ুন
new.karatoa.com.bd

Logo

প্রচ্ছদ
সোশ্যাল মিডিয়া ই-পেপার