যথাযোগ্য ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, গভীর শোক ও কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে পবিত্র আশুরা উপলক্ষে রাজধানী ঢাকায় ঐতিহ্যবাহী তাজিয়া মিছিল বের করেছেন শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষ। আজ শুক্রবার সকাল ১০টার পর পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক হোসেনি দালান থেকে এই শোকযাত্রা শুরু হয়। কারবালার ঐতিহাসিক ও হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডি স্মরণে প্রতি বছরের মতো এবারও এই বিশাল শোক মিছিলের আয়োজন করা হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সকাল থেকেই হোসেনি দালান এলাকায় সমবেত হতে শুরু করেন শিয়া সম্প্রদায়ের হাজারো মানুষ। মিছিলে অংশগ্রহণকারী নারী, পুরুষ ও শিশুদের অধিকাংশের পরনেই ছিল কালো পোশাক। শোকের আবহ ফুটিয়ে তুলতে তাদের হাতে শোভা পাচ্ছিল প্রতীকী তাজিয়া, আলাম, নিশান, বেস্তা ও বইলালাম। কারবালার সেই বিষাদময় স্মৃতিকে স্মরণ করে বুক চাপড়ে ‘হায় হোসেন, হায় হোসেন’ ধ্বনিতে মাতম করতে থাকেন অনেকে। এই করুণ সুরে চারপাশের পরিবেশ যেন এক শোকাতুর ও ভারী হয়ে ওঠে।
হোসেনি দালান থেকে শুরু হওয়া এই শোকযাত্রাটি আজিমপুর, নীলক্ষেত, নিউমার্কেট ও সায়েন্সল্যাব মোড় হয়ে ধানমন্ডিতে গিয়ে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। পুরো পথজুড়ে হাজার হাজার মানুষ মিছিলে যোগ দিচ্ছেন। শিয়া সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ জানান, কারবালার প্রান্তরে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) এবং তাঁর পরিবার ও সহচরদের নির্মম শাহাদাতের স্মরণে এই মিছিল একটি দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা ধর্মীয় ঐতিহ্য।
পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী এই হোসেনি দালান থেকেই মূলত ঢাকার তাজিয়া মিছিলের মূল সূচনা ঘটে। চার শতকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এই আচার এখন ঢাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যে রূপ নিয়েছে। মিছিলে অংশ নেওয়া প্রবীণরা জানান, শুধু ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়, বরং অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে সত্যের জয়ের প্রতীক হিসেবে এই দিনটি মানব ইতিহাসে এক চিরন্তন বার্তা বহন করে।
এদিকে তাজিয়া মিছিলকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে রাজধানীজুড়ে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক ও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। হোসেনি দালান এবং মিছিলের নির্ধারিত পুরো পথজুড়ে বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বিশেষায়িত বাহিনী সোয়াত (বিশেষ অস্ত্র ও কৌশল দল), র্যাব (র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন), পুলিশ ও ডিবি (গোয়েন্দা পুলিশ) সহ সাদা পোশাকের গোয়েন্দারা পুরো এলাকায় সতর্কাবস্থানে রয়েছেন।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ ও তল্লাশি চৌকি বসানো হয়েছে। পুরো পথেই সন্দেহভাজন ব্যক্তি এবং যানবাহনের ওপর কড়া নজরদারি রাখা হচ্ছে। বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এবং মিছিলের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ ও আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে সমন্বিত নিরাপত্তা তদারকি চালানো হচ্ছে।
মিছিলের পুরো পথে তৃষ্ণার্তদের জন্য পানি ও শরবত বিতরণের বিশেষ ব্যবস্থাও দেখা গেছে, যা কারবালায় ইমাম হোসাইন ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের পানি না পেয়ে কষ্ট পাওয়ার ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। শোকের গীত বা মার্সিয়া গাওয়ার মধ্য দিয়ে মিছিলের অংশগ্রহণকারীরা কারবালার বীরত্বগাথা তুলে ধরছেন। নিরাপত্তার কঠোর চাদরে মোড়ানো থাকলেও সাধারণ মানুষের উপস্থিতি ও আবেগ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত।
ঐতিহাসিক এই দিনটিতে কারবালার শোকাবহ ঘটনাকে স্মরণ করার পাশাপাশি বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে বিশেষ প্রার্থনাও করা হয়। যুগের পর যুগ ধরে ধর্মীয় সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে এই তাজিয়া মিছিল ঢাকার অন্যতম প্রধান একটি আয়োজনে পরিণত হয়েছে।