ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামিদের সীমান্ত পার করে দিতে সহায়তাকারী সেই আলোচিত ফিলিপ সাংমা অবশেষে ধরা পড়েছেন। শনিবার ভারতের পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন তিনি। বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে এই দুর্ধর্ষ সীমান্ত দালালকে হন্যে হয়ে খুঁজছিল। গ্রেপ্তারকৃত ফিলিপ ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার বাসিন্দা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
রাজধানীর বুকে চাঞ্চল্যকর শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে থাকা কুশীলবদের গ্রেপ্তারে বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করেছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। ঘটনার মূল হোতা ফয়সাল করিম মাসুদ এবং তার সহযোগী আলমগীর হোসেনকে অবৈধভাবে সীমান্ত পার করে দেওয়ার কারিগর হিসেবে অভিযুক্ত ফিলিপ সাংমাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে। এর আগে গত ৮ মার্চ একই এলাকা থেকে মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল এবং আলমগীরকেও গ্রেপ্তার করে ভারতের আরক্ষী বাহিনী।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পর গ্রেপ্তার এড়াতে অত্যন্ত সুকৌশলে ঢাকা ত্যাগ করেন ফয়সাল ও তার সহযোগীরা। তারা প্রথমে মিরপুর এলাকা থেকে একটি ব্যক্তিগত গাড়িতে চড়ে গাজীপুর হয়ে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে পৌঁছান। সেখানে পৌঁছে তারা গাড়ি পরিবর্তন করেন এবং হালুয়াঘাটের ধারাবাজার সংলগ্ন মুন নামের একটি জ্বালানি তেল সরবরাহ কেন্দ্রের সামনে অবস্থান নেন। সেখান থেকেই দৃশ্যে আবির্ভাব ঘটে ফিলিপ সাংমার।
ফিলিপ তার নিজস্ব দ্বিচক্রযানে (মোটরসাইকেল) করে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে ফয়সাল ও তার সহযোগীকে ভুটিপাড়া সীমান্ত এলাকায় নিয়ে যান। এই পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সম্পন্ন করা হয় যাতে স্থানীয়দের নজরে না আসে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারণা, ওই দিনই ফিলিপের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তারা ভারতের ভূখণ্ডে প্রবেশ করেন। এরপর থেকেই ফিলিপ নিজেকে আড়াল করতে তিনিও সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ওপারে চলে যান।
কে এই ফিলিপ সাংমা এবং কীভাবে চলত তার কারবার?
হালুয়াঘাট সীমান্তের গাজীর ভিটা ইউনিয়নের দুর্গম এলাকায় ফিলিপ সাংমার বসবাস। তার বাড়িটি ঠিক ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া ঘেঁষে অবস্থিত। স্থানীয়ভাবে তিনি একজন প্রভাবশালী সীমান্ত দালাল হিসেবে পরিচিত। অর্থের বিনিময়ে অবৈধভাবে মানুষ পারাপার করাই ছিল তার মূল পেশা। দুর্গম পাহাড়ি পথ এবং সীমান্তের আনাচ-কানাচ তার নখদর্পণে থাকায় অপরাধীদের কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফিলিপের বাড়ির পাশেই সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ার নিচে রয়েছে বেশ কিছু কালভার্ট ও বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের পথ। বর্ষাকালে পানি যাওয়ার জন্য তৈরি এসব সুড়ঙ্গ পথ শুষ্ক মৌসুমে অপরাধীদের যাতায়াতের নিরাপদ রুটে পরিণত হয়। ধারণা করা হচ্ছে, ঢাকার আলোচিত খুনিদের তিনি এই সুড়ঙ্গ পথ ব্যবহার করেই ওপারে পাঠিয়েছিলেন। সীমান্ত এলাকায় কড়া পাহারা থাকা সত্ত্বেও কীভাবে দিনের আলোতে এমন ঘটনা ঘটল, তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
উল্লেখ্য, গত বছরের ১২ ডিসেম্বর পবিত্র জুমার নামাজের পর রাজধানীর পুরানা পল্টন এলাকায় এক ভয়াবহ হামলার শিকার হন শরিফ ওসমান হাদি। দ্বিচক্রযানে আসা দুই সশস্ত্র হামলাকারী চলন্ত রিকশায় থাকা হাদির মাথায় খুব কাছ থেকে গুলি করে পালিয়ে যায়। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরিস্থিতির অবনতি হলে সরকারের বিশেষ তৎপরতায় তাকে আকাশপথে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। কিন্তু চিকিৎসকদের প্রাণপণ চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে ১৫ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
হাদি হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই সারা দেশে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। খুনিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে রাজপথে নামে বিভিন্ন সংগঠন। ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী ও বাস্তবায়নকারীদের ধরতে পুলিশ ও সীমান্ত রক্ষী বাহিনী যৌথ অভিযান শুরু করে। কিন্তু ফিলিপের মতো ধুরন্ধর দালালের সহায়তায় খুনিরা দেশ ত্যাগ করায় তদন্ত কিছুটা থমকে গিয়েছিল। বর্তমান এই গ্রেপ্তারের ফলে মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া আরও বেগবান হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ফিলিপ সাংমার এই গ্রেপ্তারের ঘটনাটি কেবল একটি সাধারণ অপরাধী পাকড়াও নয়, বরং এটি সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। রাজধানী থেকে আসা খুনিরা কয়েকশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে নির্বিঘ্নে সীমান্ত পার হয়ে যাচ্ছে—এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। যদি একজন সাধারণ দালালের সহায়তায় এমন জঘন্য অপরাধের আসামিরা দেশ ছাড়তে পারে, তবে তা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।
ভারতের সাথে বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় এসব আসামিকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় থাকা এ ধরনের সুড়ঙ্গ পথ ও দালাল চক্রের মূলোৎপাটন করা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো অপরাধী ন্যায়বিচারের হাত থেকে বাঁচতে বিদেশের মাটিতে আশ্রয় নিতে না পারে।