নতুন সরকারের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) দ্বিতীয় সভা আজ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। প্রায় ২৪ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ের ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের জন্য এই সভায় উপস্থাপন করা হবে। তবে সব ছাপিয়ে এবারের সভার মূল আকর্ষণ হিসেবে থাকছে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ও দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের স্বপ্নের 'পদ্মা ব্যারাজ' বা পদ্মা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প, যা দেশের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এবং সরকারের উচ্চ পর্যায়ের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, দেশের সার্বিক অবকাঠামো, দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতা আরও বেগবান করার লক্ষ্যে আজ বুধবার সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষে একনেকের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সভাটি অনুষ্ঠিত হবে। সভায় সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী এবং একনেকের শীর্ষ পদাধিকারী তারেক রহমান। সংশ্লিষ্ট শীর্ষ কর্মকর্তারা সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন, এই বৃহৎ সভার জন্য ইতিমধ্যেই সব ধরনের দাপ্তরিক প্রস্তুতি ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র চূড়ান্ত করা হয়েছে। নতুন সরকারের দ্বিতীয় এই সভায় দেশব্যাপী সুষম উন্নয়নের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে, যার প্রতিফলন দেখা গেছে প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর তালিকায়।
আজকের কার্যতালিকা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সভায় মোট ১৬টি উন্নয়ন প্রকল্প চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। এই প্রকল্পগুলোর মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২৪ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত এই ১৬টি প্রকল্পের মধ্যে ছয়টি সম্পূর্ণ নতুন উদ্যোগ হিসেবে নেওয়া হয়েছে, যা তৃণমূল পর্যায়ে নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধি করবে। এছাড়া, কাজের পরিধি বাড়ায় ছয়টি চলমান প্রকল্পের সংশোধিত রূপ উপস্থাপন করা হবে এবং বাকি চারটি চলমান প্রকল্পের কাজ নির্দিষ্ট সময়ে শেষ না হওয়ায় সেগুলোর মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাবনা রয়েছে।
তবে, দৈনন্দিন এই নিয়মিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাইরেও একটি বিশেষ বৃহৎ প্রকল্প আজকের সভায় সবার মনোযোগের কেন্দ্রে অবস্থান করছে। কার্যতালিকার ১১ নম্বরে থাকা সেই বিশেষ ও যুগান্তকারী উদ্যোগটি হলো 'পদ্মা ব্যারাজ' (পদ্মা নদীর ওপর পরিকল্পিত বাঁধ) নির্মাণ প্রকল্প। দীর্ঘদিন ধরে দেশের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় এই বাঁধ নির্মাণের আলোচনা ও গবেষণা চললেও, এবার তা বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এই প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে একনেক সভায় প্রস্তাব করা হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে এবং আজকের সভায় কাঙ্ক্ষিত অনুমোদন পেলে, চলতি বছর থেকেই এর মাঠপর্যায়ের প্রাথমিক কাজ শুরু হবে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) সরকারের এই সুবিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নের গুরুদায়িত্ব পালন করবে। পরিকল্পনা ও নকশা অনুযায়ী, ২০৩৩ সালের জুন মাসের মধ্যে এই বাঁধের নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের অর্থনৈতিক ও কারিগরি দিকটিও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, সম্পূর্ণ প্রকল্পটির জন্য মোট ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। তবে এত বিপুল অঙ্কের অর্থ একসঙ্গে ছাড় না করে, প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) এটিকে কয়েকটি ধাপে ও অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করার যৌক্তিক সুপারিশ করেছে। সেই সুপারিশের ভিত্তিতেই প্রথম পর্যায়ের কাজের জন্য ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও উৎসাহব্যঞ্জক বিষয় হলো, বিদেশি কোনো ঋণদাতা সংস্থা বা সহায়তার ওপর নির্ভর না করে, এই বিপুল পরিমাণ অর্থের পুরোটাই সরাসরি সরকারি তহবিল (রাষ্ট্রীয় কোষাগার) থেকে জোগান দেওয়া হবে।
এই বাঁধ সফলভাবে নির্মিত হলে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীতে মিঠা পানির প্রবাহ ধরে রাখা সম্ভব হবে, যা গড়াই নদী হয়ে দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার কৃষিকাজে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। পাশাপাশি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততার আগ্রাসন থেকে ওই অঞ্চলের কৃষিজমি এবং আমাদের গর্বের জীববৈচিত্র্য, বিশেষ করে সুন্দরবনকে রক্ষা করতে এই প্রকল্প একটি শক্তিশালী রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে।
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পটি শুধু একটি সাধারণ অবকাঠামো নির্মাণ নয়, বরং এটি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কয়েক কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষার এক সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ। নিজস্ব অর্থায়নে এত বড় একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের সাহসী সিদ্ধান্ত নতুন সরকারের অর্থনৈতিক আত্মবিশ্বাস ও সক্ষমতারই সুস্পষ্ট প্রতিফলন। তবে অতীত অভিজ্ঞতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, বড় প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ে ও নির্দিষ্ট বাজেটে শেষ করা সবসময়ই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাই এই ঐতিহাসিক প্রকল্পের অনুমোদন লাভের পর প্রতিটি ধাপে কঠোর নজরদারি, সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। নতুবা জনগণের কষ্টার্জিত করের টাকার অপচয় হওয়ার শঙ্কা থেকেই যায়। এমন একটি বিশাল উদ্যোগ কীভাবে দেশের সার্বিক জলবায়ু ও অর্থনীতিকে সুরক্ষিত করবে, তা নিয়ে প্রতিটি সচেতন নাগরিকের গভীরভাবে ভাবার অবকাশ রয়েছে।