আগামী ৫ আগস্ট দেশের ইতিহাসে এক অনন্য গৌরবগাথা যুক্ত হতে যাচ্ছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক বিজয় ও আত্মত্যাগকে স্মরণীয় করে রাখতে এই দিনটিকে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস’ হিসেবে পালনের ঘোষণা দিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। দিবসটি উপলক্ষে দেশজুড়ে শহীদ পরিবার এবং আন্দোলনে আহত বীর সেনানীদের বিশেষ রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনা প্রদান করা হবে।
সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আহমেদ আযম খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। সভার কার্যপত্র বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, ৫ আগস্টের অনুষ্ঠানমালাকে সর্বাত্মক ও অর্থবহ করতে দেশজুড়ে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। ঢাকা জেলা প্রশাসন ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে ঢাকার শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে মূল অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হবে। ওই দিন সকাল ১১টায় আয়োজিত এই কেন্দ্রীয় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে শহীদদের অবদানের কথা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হবে এবং আহতদের প্রয়োজনীয় সম্মাননা জানানো হবে।
শুধু রাজধানী ঢাকাতেই নয়, এই উদযাপনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়বে দেশের প্রতিটি প্রান্তে। দেশের সকল জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে স্থানীয় প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় অনুরূপ সংবর্ধনা এবং আলোচনা সভার আয়োজন করা হবে। একই সাথে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি তুলে ধরতে এবং এই ঐতিহাসিক কার্যাবলীর গুরুত্ব প্রবাসীদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের সকল দূতাবাস ও মিশনে বিশেষ আলোচনা সভার আয়োজন করা হবে।
এত বড় একটি রাষ্ট্রীয় আয়োজন সফল করতে সরকারের প্রায় সবকটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ একসাথে কাজ করছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, পুলিশ সদরদপ্তর এবং নবগঠিত জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তর সম্মিলিতভাবে এই কাজ তদারকি করছে। মাঠ পর্যায়ে অনুষ্ঠানগুলো সুচারুভাবে সম্পাদনের জন্য বিভাগীয় কমিশনার, উপ-মহাপুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি), জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের ওপর বিশেষ দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে।
দিবসের প্রথম প্রহরে ঢাকার শাহবাগে অবস্থিত জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানো হবে। দেশের প্রতিটি জেলা সদরে স্থাপিত জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভগুলোতেও একই সাথে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করা হবে। এই উদ্দেশ্যে ৫ আগস্টের আগের রাত থেকেই স্মৃতিস্তম্ভগুলোকে আকর্ষণীয় আলোকসজ্জায় সজ্জিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা আত্মত্যাগের প্রতীকগুলোকে নতুন মহিমায় ভাস্বর করে তুলবে।
গণ-অভ্যুত্থান দিবসের আবহ ছড়িয়ে দিতে দেশের প্রতিটি সিটি করপোরেশন ও পৌর এলাকায় প্রামাণ্যচিত্র ও আন্দোলনের ঐতিহাসিক আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হবে। যুব সমাজ ও শিক্ষার্থীদের মাঝে এই দিবসের তাৎপর্য পৌঁছে দিতে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আলোচনা সভা, রচনা প্রতিযোগিতা, আবৃত্তি ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে। দেশের সাধারণ মানুষের জন্য এদিন রাষ্ট্রীয় জাদুঘরগুলো কোনো প্রবেশ মূল্য ছাড়াই উন্মুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়া ডাক বিভাগ এই বিশেষ দিবসকে স্মরণীয় করে রাখতে স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করবে।
দিবসের পবিত্রতা রক্ষা এবং শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় দেশের সকল ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনা ও মোনাজাতের আয়োজন করা হবে। এছাড়া সামাজিক ও মানবিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে ৫ আগস্ট দেশের সকল সরকারি হাসপাতাল, কারাগার, সরকারি শিশু পরিবার, শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র, প্রতিবন্ধী কল্যাণ কেন্দ্র এবং ভবঘুরে আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে উন্নতমানের প্রীতিভোজের আয়োজন করা হবে। ঢাকার প্রধান প্রধান সড়ক ও সড়কদ্বীপগুলো জাতীয় পতাকা এবং রঙিন ফেস্টুন দিয়ে সাজানো হবে। রাষ্ট্রপতি ও সরকার প্রধান এই দিন দেশবাসীর উদ্দেশে বিশেষ বাণী দেবেন।
আয়োজনটি নিশ্ছিদ্র করতে সরকারের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি উচ্চপর্যায়ের উপকমিটি গঠন করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবকে প্রধান করে একটি মূল কমিটি এবং মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন শাখার অতিরিক্ত সচিবকে প্রধান করে আরও একটি সমন্বয় কমিটি কাজ করছে। এছাড়াও প্রচার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে এবং অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শকের (অপরাধ ও অভিযান) নেতৃত্বে পৃথক দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপকমিটি সার্বিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বৈরাচার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব জাগরণ। এই অভ্যুত্থানের বীর শহীদ ও আহতরা আমাদের নতুন ভোরে উঁকি দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। রাষ্ট্রীয়ভাবে এই মহান বীরদের সংবর্ধনা প্রদান কেবল তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনই নয়, বরং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাদের ঐতিহাসিক অবদানকে চিরস্থায়ী করার এক আন্তরিক প্রয়াস। তবে এই সংবর্ধনা যেন কেবল একদিনের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে; আহতদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং শহীদ পরিবারের স্থায়ী দেখভালের দায়িত্ব রাষ্ট্রকে সারাজীবন বহন করতে হবে। তবেই প্রকৃত অর্থেই বীরদের প্রতি ঋণ স্বীকার করা সম্ভব হবে।