বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাবে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম লেখানো অযোগ্য ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এরই মধ্যে তদন্ত ও যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে ৪৮১ জন অমুক্তিযোদ্ধার গেজেট (সরকারি প্রজ্ঞাপন) বাতিল করা হয়েছে বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমদ আজম খান।
দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা কলঙ্কমুক্ত করতে এবং প্রকৃত যোদ্ধাদের মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। রোববার (৫ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল মালিকের এক প্রশ্নের জবাবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমদ আজম খান এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, ২০২৪ সালের আগস্ট মাস থেকে ২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত চলমান বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে এই বিপুল সংখ্যক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সনদ ও গেজেট বাতিল করা হয়েছে।
সংসদ অধিবেশনে সিলেট-৩ আসনের প্রতিনিধি মো. আব্দুল মালিক তার বক্তব্যে অভিযোগ করেন, বিগত ১৫ বছরে দেশে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা চরমভাবে অবহেলিত ছিলেন। অন্যদিকে, একদল অসাধু ও সুবিধাভোগী ব্যক্তি রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ভুয়া তথ্য প্রদান করে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নিজেদের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছিল। এর ফলে তারা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ-সুবিধা ও সম্মানী ভোগ করে আসছিল, যা প্রকৃত বীর সন্তানদের জন্য অবমাননাকর। বিশেষ করে সিলেটের বালাগঞ্জ ও দক্ষিণ সুরমার মতো এলাকাগুলোতে এমন অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে বলে তিনি সংসদকে অবহিত করেন।
সাংসদ আব্দুল মালিকের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে মন্ত্রী আহমদ আজম খান বলেন, "বীর মুক্তিযোদ্ধারা জাতির গর্ব এবং দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান। প্রকৃতার্থে 'ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা' বলে কোনো শব্দ হতে পারে না; যারা প্রকৃত যোদ্ধা নন অথচ তালিকায় নাম লিখিয়েছেন, তারা মূলত সুযোগসন্ধানী। এই সকল অসাধু ব্যক্তিকে চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া একটি চলমান কার্যক্রম।" তিনি আরও জানান, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) অধীনে গঠিত বিশেষ উপকমিটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে নিয়মিত শুনানি গ্রহণ করছে। যথাযথ প্রমাণ ও দালিলিক তথ্যের ভিত্তিতে যাদের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণিত হচ্ছে, অবিলম্বে তাদের গেজেট ও সনদ বাতিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সিলেটের মহান মুক্তিযুদ্ধে অবদানের কথা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে মন্ত্রী বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এমএজি ওসমানী এবং সাবেক নৌবাহিনী প্রধান মাহবুব আলী খানের স্মৃতিবিজড়িত এই অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি বর্তমান সরকার গভীর শ্রদ্ধাশীল। সিলেট অঞ্চলের বীর সন্তানদের কল্যাণে সরকার নানামুখী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। বিশেষ করে প্রবাসে অবস্থানরত যে সকল বীর মুক্তিযোদ্ধা এখনো বৈদ্যুতিন সনদ (ডিজিটাল সার্টিফিকেট) বা আধুনিক পরিচয়পত্র (স্মার্ট আইডি) পাননি, তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তা প্রদানের ব্যবস্থা করা হবে।
উন্নয়ন প্রকল্পের বিষয়ে সংসদকে আশ্বস্ত করে মন্ত্রী বলেন, দক্ষিণ সুরমা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স (মুক্তিযোদ্ধা ভবন) নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে এবং দ্রুততম সময়ে এটি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহারের জন্য হস্তান্তর করা হবে। এছাড়া বালাগঞ্জ ও ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সগুলোর নির্মাণ ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়টিও মন্ত্রণালয়ের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী তার বক্তব্যে বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক দর্শনের ওপর আলোকপাত করে বলেন, এই সরকার শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং দেশের প্রথম নারী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচিত নেত্রীর আদর্শ ও চেতনাকে লালন করে। বর্তমান রাষ্ট্র কাঠামোর পুনর্গঠনে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ সম্মান ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার বদ্ধপরিকর।
সবশেষে মন্ত্রী ঘোষণা দেন যে, তিনি অচিরেই সিলেটের ঐতিহাসিক রণক্ষেত্র ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো পরিদর্শন করবেন। পরিদর্শনকালে তিনি স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় করবেন এবং কোনো প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে বাদ পড়ে থাকলে বা কোনো অযোগ্য ব্যক্তি তালিকাভুক্ত হয়ে থাকলে তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা থেকে অযোগ্যদের বাদ দেওয়ার এই উদ্যোগ জাতীয়ভাবে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও যখন রাজনৈতিক প্রভাবে ভুয়া ব্যক্তিদের তালিকাভুক্ত হওয়ার খবর আসে, তখন তা জাতির জন্য লজ্জাজনক হয়ে দাঁড়ায়। তবে এই তালিকা শুদ্ধি অভিযান যেন কেবল রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার না হয়ে ওঠে, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার সাথে প্রকৃত অমুক্তিযোদ্ধাদের চিহ্নিত করা গেলে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সংরক্ষিত হবে।