বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যকার ঐতিহাসিক মৈত্রী ও দীর্ঘস্থায়ী সহযোগিতার সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দুই দেশের বহুমুখী ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও বেগবান করার লক্ষ্যে তিনি আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ লিখিত বার্তা প্রেরণ করেছেন।
বিশ্ব রাজনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্র সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক মেলবন্ধন আরও গভীর করার প্রয়াস লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গত বুধবার (১ এপ্রিল) আবুধাবিতে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর বৈদেশিক বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিঠিটি তাঁর হাতে তুলে দেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা 'এমিরেটস নিউজ এজেন্সি' এই কূটনৈতিক তৎপরতার খবরটি গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করেছে। প্রেরিত এই লিখিত বার্তার মূল প্রতিপাদ্য ছিল দুই বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রের মধ্যকার দীর্ঘদিনের অটুট বন্ধন, পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহ এবং আগামীর টেকসই উন্নয়নের (স্থায়ী ও পরিবেশবান্ধব অগ্রগতি) লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে একযোগে কাজ করা।
বৈঠকটি অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ ও সৌহার্দ্যময় পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে। সেখানে বর্তমান বিশ্বের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক নানা সংকট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বিশেষ করে দুই দেশের পারস্পরিক অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা এবং উন্নয়নের অংশীদারিত্ব নিয়ে দুই নেতা দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন। এই সময় উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির আরব আমিরাতের নিরাপত্তা রক্ষা এবং সেই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পূর্ণ সংহতি ও অবিচল সমর্থনের কথা পুনরায় ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশের এই বন্ধুত্বপূর্ণ ও ভাতৃত্বসুলভ অবস্থানের প্রেক্ষিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপপ্রধানমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি মন্তব্য করেন যে, বাংলাদেশ তাদের অন্যতম ঘনিষ্ঠ এবং নির্ভরযোগ্য বন্ধু। তিনি আরও আশ্বস্ত করেন যে, দুই দেশের সাধারণ মানুষের উন্নয়ন, টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং শ্রমবাজারের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আরব আমিরাত সরকার গঠনমূলক সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।
এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে দুই দেশের শীর্ষস্থানীয় নীতিনির্ধারকরাও উপস্থিত ছিলেন। আরব আমিরাতের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সাঈদ আল হাজেরি এবং জ্বালানি ও অবকাঠামো মন্ত্রী সুহাইল বিন মোহাম্মদ আল মাজরুই উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশের পক্ষে সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত তারেক আহমেদসহ দূতাবাসের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বৈঠকের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে বিশেষ করে জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে নতুন বিনিয়োগের পথ প্রশস্ত হতে পারে। যেহেতু বৈঠকে আমিরাতের জ্বালানি মন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন, তাই ধারণা করা হচ্ছে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে বড় ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস পাওয়া গেছে। পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থান এবং আমিরাতে তাদের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির বিষয়েও ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত বাংলাদেশের রেমিট্যান্স (প্রবাসী আয়) আহরণের অন্যতম বড় উৎস এবং জ্বালানি আমদানির প্রধান বাজার। প্রধানমন্ত্রীর এই বিশেষ বার্তা পাঠানো কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে শক্তিশালী একটি কূটনৈতিক চাল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যখন বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা বিরাজ করছে, তখন আমিরাতের মতো একটি শক্তিশালী অংশীদারের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিতকে আরও মজবুত করবে। তবে এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হলে দক্ষ কূটনৈতিক তৎপরতা এবং নিয়মিত ফলোআপ (তদারকি) একান্ত প্রয়োজন।