আসন্ন বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রথাগত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে ভিন্ন পথে হাঁটছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। মশার বংশবিস্তার রোধে এবার কেবল একটি নয়, বরং একাধিক কীটনাশকের সমন্বিত প্রয়োগ এবং গবেষণাগারে পরীক্ষিত উন্নত মানের ওষুধের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সংস্থাটি। সোমবার এক জরুরি সভায় মশা নিয়ন্ত্রণে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের এই ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
রাজধানীতে বর্ষার আগমন মানেই মশার উপদ্রব আর ডেঙ্গুর আতঙ্ক। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সোমবার সকালে গুলশানে ডিএনসিসির প্রধান কার্যালয়ে এক উচ্চপর্যায়ের কারিগরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার মূল উদ্দেশ্য ছিল ডেঙ্গু প্রতিরোধে চলমান কার্যক্রমের মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন দিকনির্দেশনা ঠিক করা। ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খানের সভাপতিত্বে এই সভায় কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।
সভায় প্রশাসক জানান, মশা মারতে এখন থেকে আর অন্ধভাবে কোনো কীটনাশক ব্যবহার করা হবে না। বরং একাধিক কীটনাশকের সংমিশ্রণ বা সমন্বিত ব্যবহার কতটা কার্যকর, তা আগে বিভিন্ন গবেষণাগারে (ল্যাবরেটরি) পরীক্ষা করে দেখা হবে। সেই পরীক্ষার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, কেবল ওষুধ ছিটিয়ে মশা নির্মূল করা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন ব্যাপক জনসচেতনতা। নাগরিকরা যেন নিজেদের আঙিনা পরিষ্কার রাখেন, সে জন্য বিশেষ প্রচার অভিযান বা ক্যাম্পেইন জোরদার করা হবে।
সভার আলোচনায় অত্যন্ত উদ্বেগের একটি বিষয় উঠে আসে—মশার প্রতিরোধ ক্ষমতা।
কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. রাশেদুল ইসলাম জানান, বর্তমানে লার্ভা মারার জন্য (লার্ভিসাইডিং) যে ‘টেমিফস’ নামক ওষুধটি ব্যবহার করা হচ্ছে, অনেক দেশে মশা সেটির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলেছে। ব্রাজিল ও ফিলিপাইনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সঠিক সময়ে এবং সঠিক মাত্রায় ওষুধের প্রয়োগ না হলে মশা সেই বিষ সহ্য করার ক্ষমতা অর্জন করে। ফলে ওষুধ দিলেও আর মশা মরে না। এই পরিস্থিতি এড়াতে তিনি ঢাকার অন্তত পাঁচটি ভিন্ন স্থানে ওষুধের কার্যকারিতা পরীক্ষা করার পরামর্শ দেন।
সভায় কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার তার গবেষণার তথ্য তুলে ধরে বলেন, ‘নোভালিয়ন’, ‘ম্যালাথিয়ন’ ও ‘টেমিফস’—এই তিনটি কীটনাশক নিয়ে তারা মাঠ পর্যায়ে ও গবেষণাগারে পরীক্ষা চালিয়েছেন। ফলাফলে দেখা গেছে, ‘ম্যালাথিয়ন’ মশা নিধনে তুলনামূলক বেশি কার্যকর। পাশাপাশি তিনি জৈবিক উপায়ে মশা নিধনের জন্য ‘বিটিআই’ ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেন। ফগিং বা ধোঁয়া ছিটানো পদ্ধতি নিয়ে তিনি নেতিবাচক মত প্রকাশ করে বলেন, ধোঁয়া দিয়ে ওড়ন্ত মশা মারার এই পদ্ধতিটি অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ফল দেয় না। তাই ধীরে ধীরে ধোঁয়া ছিটানোর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে লার্ভা বা মশার ডিম ধ্বংস করার দিকে বেশি নজর দেওয়া উচিত।
সভায় উপস্থিত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, বর্ষায় বৃষ্টির পানি জমে থাকার কারণে এডিস মশার বংশবিস্তার বহুগুণ বেড়ে যায়। তাই এখন থেকেই নর্দমা, ডোবা ও নির্মাণাধীন ভবনগুলোতে নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী জানান, মশা নিধন কর্মীদের কাজের মান বজায় রাখতে এবং সঠিক ওষুধের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
ডিএনসিসির এই নতুন পরিকল্পনায় মশা নিধনের পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি শুরুতেই মশার প্রজনন ক্ষেত্রগুলো ধ্বংস করা যায়, তবেই ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা কমিয়ে আনা সম্ভব। সভায় অন্যান্যের মধ্যে ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বেনজির আহমেদ উপস্থিত থেকে তাদের মূল্যবান মতামত প্রদান করেন।
একটি শহরকে মশকবদ্ধ রাখতে কেবল সিটি করপোরেশনের একার চেষ্টাই যথেষ্ট নয়। যদিও প্রশাসন নতুন কীটনাশক এবং আধুনিক প্রযুক্তির কথা বলছে, তবে চূড়ান্ত বিজয় আসবে তখনই যখন সাধারণ মানুষ সচেতন হবেন। নগরের প্রতিটি বাড়ির ছাদে বা ফুলের টবে জমে থাকা স্বচ্ছ পানি যে হাজারো মানুষের প্রাণহানির কারণ হতে পারে, সেই বোধ প্রতিটি নাগরিকের হৃদয়ে জাগ্রত করা প্রয়োজন। বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতির সাথে যখন জনসচেতনতার মেলবন্ধন ঘটবে, তখনই ঢাকাবাসী একটি ডেঙ্গুমুক্ত নির্মল বর্ষা মৌসুম উপভোগ করতে পারবে।
বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমাতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) সমন্বিত কীটনাশক ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে। মশা মারতে আধুনিক ল্যাব পরীক্ষা ও কার্যকর ওষুধের প্রয়োগ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের জরুরি সভার বিস্তারিত প্রতিবেদন।