দেশের প্রশাসনিক কাঠামোয় জনবল সংকটের এক বিশাল চিত্র ফুটে উঠেছে জাতীয় সংসদে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যমতে, বর্তমানে সরকারি চাকরিতে প্রায় পৌনে পাঁচ লাখ পদ শূন্য রয়েছে। অন্যদিকে, বিগত সরকারের আমলে দায়েরকৃত হয়রানিমূলক রাজনৈতিক মামলাগুলো দ্রুত প্রত্যাহারে সরকারের সক্রিয় অবস্থানের কথা জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী।
জাতীয় সংসদের বিশেষ অধিবেশনে আজ বুধবার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর পর্বে দেশের সরকারি জনবল ও বিচার বিভাগীয় কার্যক্রমের বর্তমান চিত্র উঠে এসেছে। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী এবং আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী সংসদে জানান, সরকারের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে দেশে সরকারি চাকরিতে ৪ লাখ ৬৮ হাজার ২২০টি পদ শূন্য রয়েছে। এই হিসাবটি ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত হালনাগাদ করা তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশে বর্তমানে অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত সরকারি কর্মচারীর সংখ্যা ১৪ লাখ ৫০ হাজার ৮৯১ জন।
কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিন্যাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রথম শ্রেণিতে কর্মরত আছেন ১ লাখ ৯০ হাজার ৭৭৩ জন এবং দ্বিতীয় শ্রেণিতে ২ লাখ ৩৩ হাজার ৭২৬ জন। এছাড়া তৃতীয় শ্রেণিতে ৬ লাখ ১৩ হাজার ৮৩৫ জন এবং চতুর্থ শ্রেণিতে ৪ লাখ ৪ হাজার ৫৫৭ জন বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যান্য স্তরে রয়েছেন আরও প্রায় ৭ হাজার ৯৮০ জন। তবে এই বিশাল কর্মীবাহিনীর সমান্তরালে শূন্য পদের সংখ্যাও উদ্বেগজনক। প্রতিমন্ত্রী জানান, বর্তমানে প্রথম শ্রেণিতে ৬৮ হাজার ৮৮৪টি, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ১ লাখ ২৯ হাজার ১৬৬টি, তৃতীয় শ্রেণিতে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৭৯৯টি এবং চতুর্থ শ্রেণিতে ১ লাখ ১৫ হাজার ২৩৫টি পদ শূন্য পড়ে আছে। এই বিশাল শূন্যতা পূরণ করতে পারলে দেশের বেকার সমস্যার সমাধান ও প্রশাসনিক গতিশীলতা উভয়ই নিশ্চিত করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একই অধিবেশনে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেন। তিনি জানান, জনগণকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দায়ের করা প্রায় ২৩ হাজার ৮৬৫টি রাজনৈতিক মামলা এ পর্যন্ত প্রত্যাহার করা হয়েছে। সরকারি দলের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আশ্বস্ত করেন যে, বাকি মামলাগুলোও যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
আইনমন্ত্রী আরও বলেন, অতীতে এমনকি মৃত ব্যক্তিদের নামেও মামলা দেওয়ার নজির রয়েছে। প্রতিবন্ধী ও শিক্ষকদের পর্যন্ত মামলার জাঁতাকলে পিষ্ট হতে হয়েছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, যদি কোনো ব্যক্তি আদালতের মাধ্যমে নির্দোষ প্রমাণিত হন, তবে তার সম্মান ও মর্যাদা বজায় রাখা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। যারা এসব হয়রানিমূলক মামলার শিকার হয়েছেন, তাদের স্ব-স্ব মন্ত্রণালয় বা দপ্তরে আবেদন করার পরামর্শ দিয়েছেন মন্ত্রী। আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই করে আইনানুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একদিকে বিপুল সংখ্যক শূন্য পদ এবং অন্যদিকে হাজার হাজার রাজনৈতিক মামলা—এই দুই চিত্র দেশের প্রশাসনিক ও বিচার ব্যবস্থার গভীর ক্ষতকেই নির্দেশ করে। সরকারি চাকরিতে শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ করা গেলে একদিকে যেমন শিক্ষিত যুবসমাজের দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটবে, তেমনি সরকারি সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে জনবল সংকট দূর হবে। অন্যদিকে, রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের উদ্যোগটি দেশে সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথে একটি সাহসী পদক্ষেপ। নাগরিক অধিকার রক্ষায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই এখন সময়ের দাবি।