রাজধানীর ব্যস্ততম হৃদপিণ্ডখ্যাত গুলিস্তান এলাকা এখন সম্পূর্ণ হকারমুক্ত। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) বিশেষ অভিযানে ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত হওয়ায় সাধারণ পথচারী ও যানবাহনের চলাচলে ফিরে এসেছে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত স্বস্তি। তবে জনজীবনে এই স্বস্তি ফিরে এলেও উচ্ছেদের ফলে জীবন-জীবিকা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন কয়েক হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও হকার।
এক সময়ের জনাকীর্ণ ও বিশৃঙ্খল গুলিস্তান এখন অনেকটাই অচেনা। যে ফুটপাত দিয়ে আগে হাঁটার জায়গা ছিল না, সেখানে এখন স্বচ্ছন্দে চলাচল করছেন সাধারণ মানুষ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর থেকে আসা সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধ রহমত আলীর চোখেমুখে ছিল বিস্ময়ের ছাপ। সোমবার সকালে তিনি গ্রামের বাড়ি থেকে লঞ্চে করে নরসিংদী হয়ে বাসে করে গুলিস্তানে পৌঁছান। লক্ষ্য ছিল ধানমন্ডিতে ছেলের বাসায় যাওয়া। বাস থেকে নেমে তিনি যা দেখলেন, তা তার কল্পনার অতীত।
গুলিস্তানের সার্জেন্ট আহাদ পুলিশ বক্স, বায়তুল মোকাররম দক্ষিণ গেট, জিরো পয়েন্ট, গোলাপশাহ মাজার এবং বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ এলাকা ঘুরে দেখে রহমত আলী অবাক হয়ে যান। যেখানে আগে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না, সেখানে এখন প্রশস্ত ফুটপাত। হকারদের হাঁকডাক নেই, ক্রেতাদের ভিড় নেই, আর নেই পকেটমারের আতঙ্ক। রিকশা নিয়ে অনায়াসেই তিনি গন্তব্যে পৌঁছাতে পেরেছেন। তার মতে, "আগে গুলিস্তান মানেই ছিল এক আতঙ্কের নাম, জটলার নাম। আজ এখানে এসে মনে হচ্ছে ঢাকা শহরটা আসলে অনেক বড়।"
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের আটটি জোনের সমন্বিত উদ্যোগে এই বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। রমনা থেকে গুলশান পর্যন্ত প্রধান সড়ক ও ফুটপাতগুলো অবৈধ দখলমুক্ত রাখতে জিরো টলারেন্স (শূন্য সহনশীলতা) নীতি গ্রহণ করেছে পুলিশ। এই উদ্যোগের ফলে যানবাহন চলাচলের গতি বেড়েছে বহুগুণ। লালবাগের স্যানিটারি ব্যবসায়ী হাসান আলী জানান, আগে গুলিস্তান মোড় পার হতে যেখানে এক থেকে দেড় ঘণ্টা সময় অপচয় হতো, এখন সেখানে মাত্র কয়েক মিনিটেই পার হওয়া যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের কাছে এটি একটি বড় বিজয় হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
তবে এই মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। দীর্ঘকাল ধরে গুলিস্তানের এই ফুটপাতগুলোতে ব্যবসা করে আসছিলেন প্রায় ৫ হাজার হকার। কোনো আগাম ঘোষণা বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ছাড়াই উচ্ছেদ করায় তারা এখন দিশেহারা। বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ এলাকায় আগে কাপড়ের ব্যবসা করতেন আব্দুল্লাহ রানা। ছলছল চোখে তিনি বলেন, "আমাদের পেটে লাথি মারা হয়েছে। প্রতিদিন এখান থেকে যা আয় হতো, তা দিয়েই পরিবারের সবার মুখে অন্ন জুটত। এখন আমরা কোথায় যাবো? বিকল্প কোনো জায়গা না দিয়ে এভাবে সরিয়ে দিলে আমাদের না খেয়ে মরা ছাড়া উপায় নেই।"
একই আর্তনাদ শোনা গেল আরও অনেক হকারের কণ্ঠে। তাদের দাবি, তারা রাস্তা দখল করে ব্যবসা করতে চান না, কিন্তু তাদের কর্মসংস্থানের জন্য একটি নির্দিষ্ট জায়গা বা ‘হলিডে মার্কেট’ (ছুটির দিনের বাজার) করে দেওয়া হোক। তা না হলে এই হাজার হাজার পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হবে।
এদিকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেটরা জানিয়েছেন, জনস্বার্থে এই অভিযান অব্যাহত থাকবে। শহরকে বাসযোগ্য রাখতে এবং যানজট নিরসনে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা বাঞ্ছনীয়। যদি কেউ পুনরায় ফুটপাত দখলের চেষ্টা করে, তবে তাকে জেল-জরিমানাসহ কঠোর আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এটি কেবল সাময়িক কোনো পদক্ষেপ নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা।
গুলিস্তানের এই নতুন রূপ ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় এক ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এই পরিবর্তনের ধারা বজায় রাখতে হলে প্রয়োজন কঠোর নজরদারি। অতীতেও অনেকবার উচ্ছেদ অভিযান হয়েছে, কিন্তু কয়েকদিন পরেই আবার পুরনো রূপে ফিরে এসেছে রাস্তাগুলো। এবার সেই পুনরাবৃত্তি হবে না বলেই আশা করছেন নগরবাসী।
একটি আধুনিক ও সচল নগরী গড়তে ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত রাখা অপরিহার্য। তবে সেই শৃঙ্খলার পেছনে যেন হাজারো মানুষের দীর্ঘশ্বাস জমা না হয়, সেদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। উচ্ছেদ হওয়া হকারদের জন্য একটি নির্দিষ্ট স্থানে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা গেলে যেমন নগরীর শৃঙ্খলা বজায় থাকবে, তেমনি নিশ্চিত হবে সাধারণ মানুষের অন্নসংস্থান। উন্নয়ন এবং মানবিকতা যখন হাত ধরাধরি করে চলে, তখনই একটি শহর প্রকৃত অর্থে বাসযোগ্য হয়ে ওঠে।