সারা দেশে ভয়াবহ আকার ধারণ করছে ছোঁয়াচে রোগ হাম। গত ২৪ ঘণ্টায় এই মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে দেশে আরও ৫ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ক্রমবর্ধমান এই সংক্রমণ রোধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয় জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও আক্রান্তের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য এক অশনিসংকেত হিসেবে দেখা দিয়েছে।
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব এখন আর কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হামের লক্ষণ নিয়ে নতুন করে ১৮০ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত দেশে হামের লক্ষণ নিয়ে মোট ১১৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এই মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘতর হতে থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, রোববার সকাল ৮টা থেকে সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত সারা দেশে ১ হাজার ২৮২ জন রোগী হামের উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ৫ হাজার ৯৪০ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তবে আশার কথা হলো, যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ করে এ পর্যন্ত ৬ হাজার ১৬ জন রোগী সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরে গেছেন। কিন্তু প্রতিদিন নতুন রোগীর সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তাতে হাসপাতালের শয্যা ও চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে টানাপোড়েন তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে।
চিকিৎসকদের মতে, হাম একটি তীব্র ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ। এটি মূলত শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে ছড়ায়। আক্রান্ত শিশুর শরীরে তীব্র জ্বর, কাশি, সর্দি এবং চোখ লাল হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। এর কিছুদিন পর সারা শরীরে লালচে ফুসকুড়ি বা গুটি দেখা দেয়। সময়মতো চিকিৎসা না করালে এটি ফুসফুসে সংক্রমণ বা নিউমোনিয়া, কান পাকা এবং মস্তিষ্কের প্রদাহের মতো জটিলতা তৈরি করতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের জন্য এই রোগটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
\
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গত শুক্রবার থেকে দেশের ৩০টি উপজেলাকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এসব এলাকায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যেসব এলাকায় আক্রান্তের হার বেশি, সেসব জায়গায় শিশুদের টিকার আওতায় আনতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। টিকাদানই হচ্ছে হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। সাধারণত ৯ মাস এবং ১৫ মাস বয়সে দুই ডোজ হাম-রুবেলার টিকা দিলে এই রোগ থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব।
বর্তমানে হাসপাতালগুলোতে রোগীর ভিড় সামলাতে চিকিৎসকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। অনেক জায়গায় বিশেষ আইসোলেশন ওয়ার্ড (সংক্রামক রোগীদের জন্য আলাদা কক্ষ) তৈরি করা হয়েছে যাতে সুস্থ রোগীরা সংক্রমিত না হন। তবে গ্রামাঞ্চলে এখনো অনেক অভিভাবক সচেতন নন। অনেকে হামকে ‘মায়ের দয়া’ বা সাধারণ চর্মরোগ মনে করে কবিরাজি বা অপচিকিৎসার আশ্রয় নিচ্ছেন, যা শিশুদের জীবনের জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে বারবার অনুরোধ জানানো হচ্ছে যে, শিশুর শরীরে কোনো ধরনের ফুসকুড়ি বা অস্বাভাবিক জ্বর দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিগত কয়েক বছরে টিকাদান কর্মসূচিতে কোনো ধরনের শিথিলতা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অনেক শিশু নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি থেকে বাদ পড়ে যাওয়ায় তাদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠেনি। ফলে এখন সামান্য প্রাদুর্ভাবই বড় ধরনের বিপর্যয়ের রূপ নিচ্ছে। বর্তমান সংকট কাটিয়ে উঠতে হলে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা এবং জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো অপরিহার্য।
হামের এই সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাব আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে সামান্যতম অবহেলাও অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। টিকাদান কর্মসূচির শতভাগ সাফল্য নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতেও এমন সংকটের পুনরাবৃত্তি ঘটবে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও এই যুদ্ধে শামিল হতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি শিশুর অকাল মৃত্যু মানে একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ। তাই সচেতন হোন, সঠিক সময়ে শিশুকে টিকা দিন এবং যেকোনো উপসর্গে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।