দেশজুড়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে ব্যাংক লেনদেন ও অফিসের সময়সূচিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, আগামী রোববার থেকেই সারা দেশের সব তফসিলি ব্যাংকে নতুন এই সময়সূচি কার্যকর হতে যাচ্ছে।
বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ চাহিদা ব্যবস্থাপনায় সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণের অংশ হিসেবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। শনিবার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সরকারের ঘোষিত পরিবর্তিত অফিস সময়সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যাংকগুলোর জন্য নতুন কর্মঘণ্টা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী রোববার (৫ এপ্রিল) থেকে পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত এই নতুন নিয়ম বহাল থাকবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, দেশের সকল তফসিলি ব্যাংক (যেসব ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তালিকাভুক্ত ও সরাসরি নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়) নির্দিষ্ট সময়সূচি মেনে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করবে। তবে দেশের অর্থনৈতিক গতিশীলতা ও বৈদেশিক বাণিজ্য সচল রাখতে বিশেষ কিছু এলাকায় এই নিয়মের ছাড় দেওয়া হয়েছে। সমুদ্র বন্দর, স্থল বন্দর ও বিমানবন্দর সংলগ্ন (কাস্টমস ও পোর্ট এলাকা) ব্যাংকের শাখা এবং উপ-শাখাগুলো আগের মতোই সপ্তাহে সাত দিন ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকবে। এই বিশেষ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ২০১৯ সালে জারি করা একটি আগের পরিপত্র (সার্কুলার) পুনরায় বহাল রাখা হয়েছে। ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারার ক্ষমতাবলে জনস্বার্থে এই আদেশ জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
কেবল ব্যাংক খাতই নয়, সামগ্রিক জ্বালানি সাশ্রয়ের পরিকল্পনায় সরকারি ও বেসরকারি সব ধরনের অফিসের সময়সূচিতেও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। রোববার থেকে সব দাপ্তরিক কার্যক্রম সকাল ৯টায় শুরু হয়ে শেষ হবে বিকেল ৪টায়। গত বৃহস্পতিবার রাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার এক জরুরি বৈঠকে এই সময়সীমা চূড়ান্ত করা হয়। মন্ত্রিসভার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দিনের আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে সন্ধ্যার পর বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর চাপ কমানো যায়।
শহর ও মফস্বলের কেনাকাটার ধরনেও এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়তে যাচ্ছে। সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, রোববার থেকে দেশের কোনো শপিংমল বা বিপণিবিতান সন্ধ্যা ৬টার পর আর খোলা রাখা যাবে না। সাধারণত সন্ধ্যার পর থেকে রাত পর্যন্ত শপিংমলগুলোতে ব্যাপক আলোকসজ্জা ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) ব্যবহারের ফলে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ হয়। এই অপচয় রোধেই ব্যবসায়ীদের সন্ধ্যার মধ্যে দোকান বন্ধ করার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেও সরকার কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে। বিয়ে, জন্মদিন বা যেকোনো উৎসবের অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত আলোকসজ্জার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। বিশেষ করে ঘরোয়া বা সামাজিক অনুষ্ঠানে জাঁকজমকপূর্ণ আলোকসজ্জা বন্ধ করার মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের ওপর চাপ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও জ্বালানি ঘাটতি মোকাবিলায় সরকারের এই বহুমুখী পদক্ষেপকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারের এই কঠোর ও সময়োপযোগী পদক্ষেপগুলো দেশের সীমিত জ্বালানি সম্পদ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে শুধু সময়সূচি পরিবর্তন করলেই হবে না, বরং সাধারণ নাগরিক ও ব্যবসায়ী মহলকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। জ্বালানি সাশ্রয়ের এই কৃচ্ছ্রসাধন কেবল সাময়িক ব্যবস্থা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতির সঙ্গে সাধারণ মানুষ কতটা খাপ খাইয়ে নিতে পারে এবং এতে অর্থনীতির চাকা কতটা সচল থাকে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।