বিশ্ব চলচ্চিত্রের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ও কাঙ্ক্ষিত আসর ৯৮তম একাডেমি অ্যাওয়ার্ডস বা অস্কারের পর্দা উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে। ডলবি থিয়েটারে দেশ-বিদেশের খ্যাতিমান তারকাদের পদভারে মুখরিত লাল গালিচা আর চোখধাঁধানো আলোকসজ্জার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে এই সোনালি ট্রফি জয়ের চূড়ান্ত লড়াই।
সারা বিশ্বের সিনেমাপ্রেমীদের দৃষ্টি এখন রূপালি জগতের রাজধানী লস অ্যাঞ্জেলেসের দিকে। বর্ণিল আয়োজনে শুরু হওয়া এবারের অস্কার অনুষ্ঠানের সঞ্চালনার গুরুদায়িত্ব পালন করছেন জনপ্রিয় কৌতুক অভিনেতা ও উপস্থাপক কোনান ও’ব্রায়েন। অনুষ্ঠানের শুরুতেই তার স্বভাবজাত রসিকতা আর প্রাণবন্ত উপস্থাপনা দর্শকদের মুগ্ধ করে। বিশেষ করে ‘উইপনস’ (অস্ত্রশস্ত্র) চলচ্চিত্রটিকে ঘিরে তার একটি মজাদার অভিনয় বা স্কেচ উপস্থিত আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে হাসির রোল তুলে দেয়।
কাকতালীয়ভাবে এবারের আসরের প্রথম পুরস্কারটি ঝুলিতে ভরেছে সেই ‘উইপনস’ চলচ্চিত্রটিই। এই সিনেমায় অসাধারণ অভিনয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রীর অস্কার জিতে নিয়েছেন অভিজ্ঞ অভিনেত্রী অ্যামি ম্যাডিগান। অন্যদিকে, সেরা পার্শ্ব অভিনেতার বিভাগে বাজিমাত করেছেন হলিউডের প্রথিতযশা তারকা শন পেন। পল থমাস অ্যান্ডারসন পরিচালিত ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’ (এক যুদ্ধের পর আরেক যুদ্ধ) সিনেমায় একজন সাবেক বিপ্লবীর চরিত্রে অনবদ্য অভিনয়ের জন্য তিনি এই মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা পান।
এবারের অস্কারে এখন পর্যন্ত দুটি চলচ্চিত্রের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আলোচনার কেন্দ্রে থাকা প্রথম সিনেমাটি হলো ‘সিনার্স’ (পাপীরা), যা মূলত দক্ষিণী কৃষ্ণাঙ্গ সংস্কৃতি ও ব্লুজ সংগীতের (এক ধরণের বিষাদময় সুর) পটভূমিতে নির্মিত একটি ভ্যাম্পায়ার থ্রিলার (রক্তচোষা রোমাঞ্চকর চলচ্চিত্র)। অন্যটি হলো ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’, যেখানে একজন মানুষের জীবনসংগ্রামের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত অভিবাসীদের রূঢ় বাস্তবতাকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
এখন পর্যন্ত ঘোষিত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলোতে বিজয়ীদের তালিকায় নাম লিখিয়েছেন যারা:
সেরা কাস্টিং (শিল্পী নির্বাচন) বিভাগে পুরস্কার জিতেছেন ক্যাসান্দ্রা কুলুকুন্ডিস (ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার)। সেরা এনিমেটেড ফিচার ফিল্ম (চিত্রায়িত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র) বিভাগে বিজয়ীর মুকুট পরেছে ‘কে-পপ ডেমন হান্টার্স’। সাজসজ্জা বা মেকআপ ও হেয়ারস্টাইলিং বিভাগে ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ চলচ্চিত্রের জন্য পুরস্কৃত হয়েছেন মাইক হিল, জর্ডান স্যামুয়েল ও ক্লিওনা ফুরে। একই সিনেমা অর্থাৎ ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’-এর জন্য সেরা কস্টিউম ডিজাইন বা পোশাক পরিকল্পনার পুরস্কার জিতেছেন কেট হাওলি।
স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের বিভাগে এবার চমক দেখা গেছে। সেরা লাইভ অ্যাকশন শর্ট ফিল্ম (জীবন্ত অভিনয়ের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র) বিভাগে যৌথভাবে বিজয়ী হয়েছে ‘দ্য সিঙ্গার্স’ এবং ‘টু পিপল এক্সচেঞ্জিং সেলাইভা’। এছাড়া সেরা এনিমেটেড শর্ট ফিল্ম (চিত্রায়িত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র) হিসেবে অস্কার জিতেছে ‘দ্য গার্ল হু ক্রাইড পার্লস’ (যে বালিকা মুক্তা ঝরিয়ে কাঁদত)।
অনুষ্ঠানের শুরুর এই মুহূর্তগুলো দর্শকদের মধ্যে প্রবল উত্তেজনা সৃষ্টি করলেও অস্কারের মূল আকর্ষণগুলো এখনও বাকি। সেরা চলচ্চিত্র, সেরা অভিনেতা ও সেরা অভিনেত্রীর মতো বড় এবং প্রভাবশালী বিভাগগুলোর ফলাফল ঘোষণার অপেক্ষায় এখন রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে কোটি কোটি দর্শক। ডলবি থিয়েটারের মঞ্চে কার হাতে উঠবে বছরের সেরা স্বীকৃতি, তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই।
উল্লেখ্য, স্থানীয় সময় গত ১৫ মার্চ রবিবার সন্ধ্যায় লস অ্যাঞ্জেলেসে এই মহোৎসব শুরু হয়। বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী সোমবার ভোর ৬টা থেকে এই আয়োজন সরাসরি সম্প্রচারিত হচ্ছে। এর আগে থেকেই লাল গালিচায় তারকাদের ঝলমলে উপস্থিতি আর দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমের ভিড়ে অস্কারের আসর হয়ে ওঠে এক মিলনমেলা।
অস্কারের এবারের আসর কেবল গ্ল্যামার আর আভিজাত্যের নয়, বরং বৈচিত্র্যময় গল্পের এক বড় স্বীকৃতি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে অভিবাসী জীবন আর প্রান্তিক মানুষের যাপিত সংগ্রামের চিত্র যেভাবে মূলধারার সিনেমায় জায়গা করে নিয়েছে, তা ইতিবাচক। প্রথম দিকের পুরস্কারগুলোতে ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’-এর জয়জয়কার প্রমাণ করে যে, একাডেমি এখন বাণিজ্যিক ধারার পাশাপাশি জীবনমুখী ও বাস্তবধর্মী চলচ্চিত্রের দিকেও ঝুঁকছে। তবে চূড়ান্ত পুরস্কারগুলো কার হাতে যায়, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী বছরের বিশ্ব চলচ্চিত্রের নতুন গতিপথ। এই সোনালি ট্রফি কেবল একজন শিল্পীর ক্যারিয়ারের অর্জন নয়, বরং এটি সমকালীন সময়ের শিল্প ও সংস্কৃতির এক অনন্য দলিল।