ঢাকঢোলের বাদ্য আর রঙ-তুলির আঁচড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে শুরু হয়েছে ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের বর্ষবরণ প্রস্তুতি। তবে দীর্ঘদিনের পরিচিত ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামটি বাদ দিয়ে এবারও ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’র মাধ্যমেই নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
সোমবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের জয়নুল চিত্রশালার সামনের অলিন্দে (ভবনের প্রবেশপথের সামনের খোলা জায়গা) প্রথাগত ঢাকের শব্দ আর শিক্ষার্থীদের ছবি আঁকার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রস্তুতি পর্বের উদ্বোধন করা হয়। বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ উদযাপনে চারুকলার এই ব্যস্ততা চিরচেনা হলেও গত বছরের মতো এবারও শোভাযাত্রার নামকরণ নিয়ে চারদিকে বেশ কৌতূহল দেখা দিয়েছে।
আসন্ন বঙ্গাব্দ ১৪৩৩ উদযাপন উপলক্ষে গত রবিবার সরকারের পক্ষ থেকে একটি তথ্যবিবরণী প্রকাশ করা হয়। সেখানে দেশব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচির কথা উল্লেখ থাকলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের উদ্যোগটিকে কেবল ‘বর্ষবরণ শোভাযাত্রা’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। এতে স্পষ্ট হয় যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কালে শুরু হওয়া ধারা অনুসরণ করে এবারও আয়োজনের নাম থেকে ‘মঙ্গল’ শব্দটি বাদ রাখা হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে চারুকলা অনুষদের প্রধান (ডিন) অধ্যাপক আজহারুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি গত বছরই পরিষ্কার করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, পহেলা বৈশাখে চারুকলা থেকে যখন প্রথম এই শোভাযাত্রাটি শুরু হয়েছিল, তখন এর নাম ছিল ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’। পরবর্তীতে কোনো এক সময়ে এর নাম পরিবর্তন হয়ে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ হয়ে গিয়েছিল। তিনি দাবি করেন, তারা কোনো মৌলিক পরিবর্তন করেননি, বরং আদি ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় ফিরে গিয়েছেন। এবারের আয়োজনটি আরও বেশি সর্বজনীন ও সবাইকে নিয়ে করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে তিনি জানান।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা। তিনি বলেন, নতুন বছরের উৎসবটি সফলভাবে সম্পন্ন করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে যেন সবাই মিলে বর্ষবরণ করতে পারে, সে লক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রবীণ চিত্রশিল্পী অধ্যাপক আবদুস সাত্তার বলেন, একটি জাতির ঐক্য ও শক্তির মূল উৎস হলো তার সংস্কৃতি। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল নিদর্শন হলো পহেলা বৈশাখ। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সবার সম্মিলিত সহযোগিতায় এবারের আয়োজনটি বরাবরের মতোই সুন্দর ও সার্থক হবে। চারুকলা অনুষদের প্রধান অধ্যাপক আজহারুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা রক্ষা কর্মকর্তা (প্রক্টর) অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমদসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত শতাব্দীর আশির দশকে যখন দেশে সামরিক শাসনের কালো ছায়া ছিল, তখন সেই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে মুক্তি এবং স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে চারুকলা থেকে এই শোভাযাত্রার সূচনা হয়। ২০১৬ সালে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেস্কো) এই বিশেষ আয়োজনটিকে মানবতার অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে বিশ্ব দরবারে স্বীকৃতি দেয়। প্রতি বছর পহেলা বৈশাখের সকালে রমনার বটমূলে ছায়ানটের গান শেষে জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে এই শোভাযাত্রা শুরু হওয়া এক অবিচ্ছেদ্য ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছিল।
তবে গত কয়েক বছর ধরে বিশেষ করে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই আয়োজনের নাম নিয়ে দেশের বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক মহলে নানা বিতর্ক দেখা দেয়। সেই বিতর্কের সূত্র ধরেই ২০২৫ সাল থেকে চারুকলার এই প্রধান কর্মসূচির নাম ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। নাম পরিবর্তন হলেও উৎসবের আমেজ ও শিল্পকর্মে কোনো কমতি রাখা হবে না বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তারা এখন দিনরাত এক করে তৈরি করছেন নানা মুখোশ, মাটির সরা এবং লোকজ শিল্পকর্ম, যা বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যকে বহন করে।
পহেলা বৈশাখ কেবল একটি পঞ্জিকার দিন পরিবর্তন নয়, এটি বাঙালির অস্তিত্ব ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক অনন্য মিলনমেলা। দীর্ঘ সময় ধরে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামটির সাথে এ দেশের মানুষ অভ্যস্ত হয়ে উঠলেও পরিবর্তিত বাস্তবতায় ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ নামে এই আয়োজনটি করা হচ্ছে। নামের এই পরিবর্তন কি কেবল ঐতিহ্যের মূলে ফেরার চেষ্টা, নাকি সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপের মুখে এক ধরনের আপস—তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন থেকে যায়। তবে নামের চেয়েও বড় বিষয় হলো উৎসবের চেতনা। একটি অসাম্প্রদায়িক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও উৎসবমুখর আয়োজনের মাধ্যমে বাঙালি যদি তার সংস্কৃতিকে ধরে রাখতে পারে, তবেই এর সার্থকতা। নাম পরিবর্তনের এই ধারা আগামীর নতুন প্রজন্মের কাছে এই উৎসবকে কীভাবে উপস্থাপন করে, সেটিই এখন বড় আলোচনার বিষয়।