পবিত্র ঈদুল ফিতর ও রমজানকে সামনে রেখে দেশের অর্থনীতিতে বইছে স্বস্তির হাওয়া। ইতিহাসের সব রেকর্ড ভেঙে গত মার্চ মাসে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ৩৭৫ কোটি মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স), যা একক মাস হিসেবে এযাবৎকালের সর্বোচ্চ প্রাপ্তি।
দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত স্থিতিশীলতা ফিরতে শুরু করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ মাসে প্রবাসীরা রেকর্ড পরিমাণ অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন। এর আগে গত বছরের মার্চে এসেছিল ৩৩০ কোটি ডলার। শুধু মার্চ মাসই নয়, গত ডিসেম্বর থেকে টানা চার মাস ধরে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ ৩০০ কোটি ডলারের ওপরে অবস্থান করছে। গত ডিসেম্বরে প্রবাসীরা পাঠিয়েছিলেন ৩২২ কোটি ডলার, জানুয়ারিতে ৩১৭ কোটি এবং দিনের সংখ্যা কম হওয়া সত্ত্বেও ফেব্রুয়ারিতে দেশে এসেছে ৩০২ কোটি ডলার।
ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তারা বলছেন, এই উল্লম্ফনের পেছনে বেশ কিছু জোরালো কারণ কাজ করেছে। সাধারণত উৎসবের মাসে প্রবাসীরা পরিবারের জন্য অতিরিক্ত অর্থ পাঠিয়ে থাকেন। তবে এবারের প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে প্রবাসীদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা কাজ করছে। এই আশঙ্কায় অনেকেই প্রবাসে জমানো অর্থ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে দেশে স্বজনদের কাছে পাঠিয়েছেন।
পাশাপাশি বর্তমান সরকারের কঠোর অবস্থানও বড় ভূমিকা পালন করছে বলে মনে করা হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের মতো বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারও বিদেশে অর্থপাচার ঠেকাতে এবং পাচার করা সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনতে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। সরকারের এই অনড় অবস্থানের কারণে অবৈধ পথে (হুন্ডি) ডলারের চাহিদা কমেছে এবং বৈধ পথে ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর হার বহুগুণ বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত মোট ২ হাজার ৬২১ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স দেশে এসেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই অংক ছিল ২ হাজার ১৭৮ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আয় বেড়েছে ২০ দশমিক ৩১ শতাংশ।
বৈশ্বিক প্রতিকূল পরিস্থিতি এবং দেশের রপ্তানি আয়ে কিছুটা ভাটা থাকলেও প্রবাসী আয়ের এই জোয়ার দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে (মজুদ অর্থ) শক্তিশালী করেছে। বর্তমানে দেশের মোট রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪ দশমিক শূন্য ৬ বিলিয়ন ডলারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মানদণ্ড অর্থাৎ বিপিএম-৬ পদ্ধতি অনুযায়ী এর পরিমাণ ২৯ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার। উল্লেখ্য, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় এই রিজার্ভ আশঙ্কাজনকভাবে কমে ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছিল। বর্তমানে ডলারের বিনিময় হার ১২২ টাকা ৭৫ পয়সায় স্থিতিশীল রয়েছে, যা দেশের আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের জন্য বড় স্বস্তি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
প্রবাসী আয়ের এই অভূতপূর্ব জোয়ার দেশের অর্থনীতির ভিতকে পুনরায় মজবুত করছে। তবে এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে প্রবাসীদের জন্য সরকারি সুযোগ-সুবিধা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। হুন্ডি প্রতিরোধে কঠোর নজরদারির পাশাপাশি বৈধ পথে অর্থ পাঠানোকে আরও সহজ ও লাভজনক করতে পারলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সংকট চিরতরে দূর হওয়া সম্ভব। প্রবাসীরা যে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, এই রেকর্ড তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।