প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো রাজধানীর নয়া পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পা রাখলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান। রোববার সন্ধ্যায় তার এই সফরকে কেন্দ্র করে নয়া পল্টন এলাকায় এক অভূতপূর্ব জাগরণ ও আনন্দঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে রোববার সন্ধ্যা ঠিক ৭টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন নয়া পল্টনের দলীয় কার্যালয়ের সামনে এসে পৌঁছান, তখন সেখানে উপস্থিত হাজার হাজার নেতাকর্মী ও সমর্থক গগনবিদারী স্লোগানে তাকে স্বাগত জানান। প্রধানমন্ত্রীর আগমনের সংবাদে দুপুর আড়াইটা থেকেই দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা ব্যানার ও ফেস্টুন হাতে কার্যালয়ের সামনে জড়ো হতে শুরু করেন। বিকেল সাড়ে ৪টা বাজার আগেই নয়া পল্টনের ভিআইপি রোড (গুরুত্বপূর্ণ সড়ক) এবং এর আশেপাশের অলিগলি জনসমুদ্রে পরিণত হয়। নেতাকর্মীদের ‘তারেক রহমানের আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম’ স্লোগানে পুরো এলাকা মুখরিত হয়ে ওঠে।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে ঘিরে রাজধানীর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত জোরদার। বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনীর (এসএসএফ) সদস্যসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা সকাল থেকেই কার্যালয়ের চারপাশ এবং প্রবেশপথগুলোতে কড়া নজরদারি বজায় রাখেন। কার্যালয়ের ভেতরের এবং বাইরের পরিবেশ সুশৃঙ্খল রাখতে দলের নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীও তৎপর ছিল।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, কার্যালয়ে প্রবেশের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমেই উপস্থিত নেতাকর্মীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। এরপর তিনি কার্যালয়ের তৃতীয় তলায় অবস্থিত চেয়ারম্যানের নির্দিষ্ট কক্ষে বসেন। প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত সংবাদ সচিব আতিকুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে আসার পর দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে একটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে মিলিত হন। সেখানে তিনি দলের সাম্প্রতিক সাংগঠনিক কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে দিকনির্দেশনামূলক আলোচনা করেন। বিশেষ করে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে তিনি নেতাদের পরামর্শ দেন।
গুরুত্বপূর্ণ এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ এবং সহ-সভাপতি (ভাইস চেয়ারম্যান) নুরুল ইসলাম মনিসহ কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যান্য জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দ। দলীয় প্রধানের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ আলোচনার সময় এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের পর নিজেদের নেতাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দলীয় কার্যালয়ে পেয়ে অনেক প্রবীণ নেতাকেও আবেগপ্রবণ হতে দেখা যায়।
নয়া পল্টনে আসার আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় সংসদ ভবনে বিএনপির সংসদীয় দলের এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় অংশগ্রহণ করেন। সংসদীয় দলের প্রধান হিসেবে তার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেই বৈঠকে সংসদের চলমান অধিবেশন এবং আইন প্রণয়ন কার্যক্রমে বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সংসদীয় বৈঠক শেষ করেই তিনি সরাসরি দলীয় কার্যালয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হন।
উল্লেখ্য যে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দায়িত্ব নেওয়ার পর রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রধানমন্ত্রী। তবে শত ব্যস্ততার মাঝেও নিজ দলের কর্মীদের কথা ভুলে যাননি তিনি—এদিন নয়া পল্টনে তার উপস্থিতি সেই বার্তাই পৌঁছে দিয়েছে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মাঝে। দলীয় কার্যালয়ে অবস্থানের সময় তিনি প্রতিটি তলায় গিয়ে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য কর্মীদের খোঁজখবর নেন এবং সুশৃঙ্খলভাবে সংগঠন পরিচালনার তাগিদ দেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের নয়া পল্টন সফর কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ভ্রমণ নয়, বরং এটি তার রাজনৈতিক শেকড়ের প্রতি অবিচল আস্থার প্রতীক। রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর অনেক ক্ষেত্রেই নেতারা তৃণমূল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, কিন্তু তারেক রহমান কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এসে প্রমাণ করলেন যে তিনি কর্মীদের আবেগ ও প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। এই সফর ঝিমিয়ে পড়া তৃণমূল কর্মীদের মাঝে নতুন করে প্রাণের সঞ্চার করবে এবং সরকারি কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সাংগঠনিক শক্তিকেও সংহত করবে। ক্ষমতা ও দলের মধ্যে এই সমন্বয় দীর্ঘমেয়াদে দেশের স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক হিসেবেই দেখা হচ্ছে।