রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালটিতে ৯৮ জন শিশু চিকিৎসাধীন থাকলেও উদ্বেগজনক তথ্য হচ্ছে, আক্রান্তদের সিংহভাগই টিকা নেওয়ার বয়সের নিচের শিশু। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে দীর্ঘ তিন বছর পরিত্যক্ত পড়ে থাকার পর অবশেষে রাজশাহী শিশু হাসপাতালটি চালুর ঘোষণা দিয়েছে সরকার।
রাজশাহীতে হামের সংক্রমণ পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করছে। সোমবার দুপুর থেকে মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে রামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে দুই শিশু। হাসপাতালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে ভর্তি থাকা শিশুদের মধ্যে একটি বড় অংশ অর্থাৎ প্রায় ৬৫ শতাংশেরই বয়স ছয় মাসের নিচে। অথচ নিয়ম অনুযায়ী শিশুদের হামের টিকা দেওয়া হয় নয় মাস বয়সে। টিকার আওতার বাইরের এই শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ৯৮ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন আছে, যার মধ্যে গত এক দিনেই নতুন করে ভর্তি হয়েছে ১৬ জন। আক্রান্তদের মধ্যে সবথেকে বেশি শিশু এসেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা থেকে, যার সংখ্যা ৪৭। এ ছাড়া রাজশাহী, নওগাঁ, কুষ্টিয়া, নাটোর, পাবনা ও মেহেরপুর থেকেও শিশুরা এখানে চিকিৎসা নিতে আসছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষা করে এখন পর্যন্ত ৩৫ জন শিশুর দেহে হামের ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে।
রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে জানান, যেহেতু ছয় মাসের কম বয়সী শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে, তাই সরকার এখন থেকে নয় মাসের পরিবর্তে ছয় মাস বয়স থেকেই হামের টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে হাসপাতালে পৃথক আইসোলেশন (বিচ্ছিন্নকরণ) ওয়ার্ড ও কর্নার চালু করা হয়েছে। তবে জটিল রোগীদের জন্য নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) তীব্র সংকট দেখা দেওয়ায় কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র বা ভেন্টিলেটরের জন্য মন্ত্রণালয়ে জরুরি আবেদন জানানো হয়েছে।
এদিকে, আইসিইউর অভাবে শিশুদের মৃত্যুর বিষয়টি দেশজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি করলে টনক নড়ে প্রশাসনের। নগরের বন্ধগেট এলাকায় প্রায় ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ২০০ শয্যার রাজশাহী শিশু হাসপাতালটি তিন বছর ধরে নির্মাণকাজ শেষ করে পড়ে থাকলেও তা চালু করা হয়নি। মঙ্গলবার স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী হাসপাতালটি পরিদর্শনে এসে আগামী তিন মাসের মধ্যে এর বহির্বিভাগ (আউটডোর) সেবা চালুর প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি স্বীকার করেন যে, অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও সঠিক সমন্বয়ের অভাবে সেবা কার্যক্রম শুরু করা যায়নি।
জরুরি পরিস্থিতি সামাল দিতে ঢাকা থেকে সাতটি নতুন ভেন্টিলেটর আনা হয়েছে এবং সংক্রামক ব্যাধি নেই এমন শিশুদের প্রয়োজনে রাজশাহী হার্ট ফাউন্ডেশনের আইসিইউতে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পাশাপাশি অব্যবহৃত সদর হাসপাতাল ও বক্ষব্যাধি হাসপাতালগুলোকেও সচল করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
রাজশাহীতে শিশুদের এই মৃত্যু এবং চিকিৎসার জন্য হাহাকার আমাদের স্বাস্থ্য খাতের এক রূঢ় বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। একদিকে টিকার আওতার বাইরের শিশুদের আক্রান্ত হওয়া যেমন নতুন করে ভাবনার উদ্রেক করে, তেমনি আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল তিন বছর ধরে তালাবদ্ধ থাকা প্রশাসনের চরম অবহেলারই প্রতিফলন। কেবল মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হলেই কেন আমাদের টনক নড়বে? জনস্বাস্থ্যের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও অবকাঠামোর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।