দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ও ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে রাশিয়ার কাছ থেকে বড় অংকের ডিজেল আমদানির জোরালো উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে সৃষ্ট জটিলতা এড়াতে রাশিয়ার কাছ থেকে প্রায় ছয় লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল আমদানিতে বিশেষ ছাড় চেয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়েছে ঢাকা।
সোমবার সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দেশের বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অপারেশন অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী। তিনি জানান, বৈশ্বিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে রাশিয়ার ওপর থাকা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে নিবিড় আলোচনা চলছে।
মার্কিন দপ্তরে প্রস্তাব ও চিঠির উত্তর
যুগ্ম সচিব জানান, রাশিয়ার জ্বালানি তেলের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা থাকলেও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ বেশ কিছু রাষ্ট্র বিশেষ ছাড় বা 'নিষেধাজ্ঞা শিথিল' সুবিধা পেয়ে আসছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও একই ধরনের সুযোগ চেয়ে মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। পবিত্র ঈদুল ফিতরের ঠিক আগে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে ঢাকার পক্ষ থেকে অন্তত দুই মাস বা ছয় লাখ মেট্রিক টন ডিজেল আমদানির অনুমতি চাওয়া হয়। মার্কিন কর্মকর্তারা এই প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি দেওয়ার পরামর্শ দেন। সরকারের পক্ষ থেকে ঈদের পরপরই সেই চিঠি পাঠানো হয়েছে এবং বর্তমানে ওয়াশিংটনের উত্তরের জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে।
ভারত থেকে আমদানির চিত্র ও সংকট
প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে জ্বালানি আমদানির দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকলেও সেখান থেকে তেল পাওয়ার গতি ছিল অত্যন্ত ধীর। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর আগে ভারত থেকে মাত্র পাঁচ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেল পেয়েছিল বাংলাদেশ। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ৬০ হাজার মেট্রিক টন তেল দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা বাস্তবায়নে মন্থরতা দেখা দেয়। তবে সরকারের উচ্চপর্যায়ের চিঠিপত্র আদান-প্রদান এবং ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনার পর পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। বর্তমানে ভারত থেকে নিয়মিত তেলের চালান আসছে। এ পর্যন্ত ২২ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল ভারত থেকে বাংলাদেশে এসে পৌঁছেছে।
বিকল্প উৎসের সন্ধানে বৈশ্বিক দৌড়ঝাঁপ
শুধুমাত্র ভারত বা রাশিয়ার ওপর নির্ভর না থেকে সরকার জ্বালানি সংগ্রহের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছে। যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী জানান, ইন্দোনেশিয়া থেকে শিগগিরই ৬০ হাজার মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার দুটি বিশাল পণ্যবাহী জাহাজ আসার কথা রয়েছে। এ ছাড়া সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, আজারবাইজান, কাজাখস্তান, অ্যাঙ্গোলা, অস্ট্রেলিয়া এবং খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। সরকারের উদ্দেশ্য হলো, কোনো একটি উৎসে সমস্যা দেখা দিলে যেন অন্য উৎস থেকে দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়। ইতিমধ্যে অস্ট্রেলিয়া এবং অ্যাঙ্গোলা থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সংগ্রহের বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে।
হরমুজ প্রণালির ঝুঁকি ও কৌশল
মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বর্তমানে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই পথ দিয়ে যাতায়াত সীমিত করা হয়েছে। তবে ইরান সরকার বাংলাদেশসহ পাঁচটি দেশ— ভারত, পাকিস্তান, চীন ও রাশিয়াকে এই পথ দিয়ে সীমিত পরিসরে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে ইরানি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলোচনা করেছে বাংলাদেশ সরকার। তবে যুদ্ধাবস্থার কারণে বিদেশি পতাকাবাহী জাহাজগুলো এই পথে চলাচলে অনীহা দেখাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের নিজস্ব পতাকাবাহী জাহাজ ব্যবহার করে জ্বালানি পরিবহন করা যায় কি না, তা নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবছে জ্বালানি বিভাগ।
সরকার মনে করছে, রাশিয়ার তেল আমদানির অনুমতি পাওয়া গেলে দেশের বাজারে জ্বালানির দাম স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে এবং কৃষি ও শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যাবে। এখন পুরো বিষয়টি নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এবং ওয়াশিংটনের ইতিবাচক সিদ্ধান্তের ওপর।
জ্বালানি নিরাপত্তা যেকোনো দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। বাংলাদেশ বর্তমানে যে বহুমুখী জ্বালানি নীতি গ্রহণ করেছে, তা দূরদর্শী হলেও বৈশ্বিক রাজনীতির মারপ্যাঁচে তা যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং। রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা কেবল অর্থনৈতিক বিষয় নয়, এর সাথে জড়িয়ে আছে গভীর কূটনৈতিক সমীকরণ। একদিকে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, অন্যদিকে সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি সংগ্রহ করে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখা—এই দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ সরকার কীভাবে সামলায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে দেশীয় পতাকাবাহী জাহাজের সক্ষমতা বাড়ানো এবং আমদানির ক্ষেত্রে একক দেশের ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে।