বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় এবং জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ সাশ্রয় নিশ্চিত করতে এক সাহসী ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশের ব্যবসায়ী সমাজ। এখন থেকে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের সব ধরনের দোকানপাট, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও বিপণিবিতান (শপিংমল) রাত ৮টার মধ্যেই বন্ধ করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ সংকটের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে সরকারকে সহযোগিতা করার লক্ষে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতি। গত বৃহস্পতিবার সংগঠনের পক্ষ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দেশের সব ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
সংগঠনটি জানিয়েছে, বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতি এবং ঢাকা মহানগর দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির স্থায়ী কমিটির (স্ট্যান্ডিং কমিটি) এক যৌথ সভায় সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। সভায় উপস্থিত ব্যবসায়ী নেতারা একমত হন যে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ অপচয় রোধ করা কেবল সরকারি দায়িত্ব নয়, বরং দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিক ও ব্যবসায়ীর নৈতিক কর্তব্য।
বিজ্ঞপ্তিতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, "আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চলমান জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা এখন সময়ের দাবি। সরকারকে এই সংকটে সহযোগিতা করার উদ্দেশ্যে আমরা ঢাকা শহরসহ সারা বাংলাদেশের সকল দোকানপাট, বাণিজ্যিক বিতান এবং বিপণিবিতানগুলো রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।" ব্যবসায়ীদের এই স্বপ্রণোদিত উদ্যোগকে অনেকে জাতীয় স্বার্থে এক ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
তবে জনজীবনের জরুরি প্রয়োজন ও মানবিক দিক বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্তের আওতা থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাতকে বাইরে রাখা হয়েছে। এই নিয়মের বাইরে থাকবে জীবন রক্ষাকারী ওষুধের দোকান (ফার্মেসি), আবাসিক হোটেল, খাবারের হোটেল বা রেস্তোরাঁ এবং সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় কাঁচাবাজার। এ ছাড়া জরুরি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের কার্যক্রম স্বাভাবিক নিয়মেই পরিচালনা করতে পারবে।
এই সিদ্ধান্তের প্রভাব ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের মাত্রা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান টিপু জানান, এই সিদ্ধান্তের ফলে ঠিক কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে তার সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান এখন পর্যন্ত তৈরি করা হয়নি। তবে এর আগে করোনা মহামারির সময় যখন রাত ৮টার পর দোকান বন্ধ রাখা হতো, তখন বড় অঙ্কের বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার আলোকেই ব্যবসায়ীরা আবারও একই পথে হাঁটতে চান।
তিনি আরও বলেন, "আমরা মনে করি রাত ৮টার মধ্যে বেচাকেনা শেষ করে দোকান বন্ধ করার বিষয়টি ব্যবসায়ীদের জন্য খুব বেশি সমস্যার কারণ হবে না। কারণ ইতিপূর্বেও ব্যবসায়ীরা এমন সময়সূচিতে অভ্যস্ত ছিলেন। এটি আমাদের অভ্যাসের একটি পরিবর্তন মাত্র, যা বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে অত্যন্ত জরুরি।"
মজার ব্যাপার হলো, এই সিদ্ধান্তটি সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আইনি আদেশ বা বাধ্যতামূলক নির্দেশনা হিসেবে আসেনি। বরং দেশের ব্যবসায়ী সমাজ নিজেদের দায়িত্ববোধ থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছে। বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের অস্থিতিশীলতার কারণে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো যাতে চাপের মুখে না পড়ে, সেই চিন্তা থেকেই ব্যবসায়ীদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ।
ঢাকার বিভিন্ন বাজারের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরাও এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন। তাদের মতে, রাত ৮টার মধ্যে দোকান বন্ধ হলে ব্যক্তিগত জীবনেও কিছু শৃঙ্খলা ফিরে আসবে এবং বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয় হওয়ার ফলে ব্যবসায়িক খরচও কিছুটা কমবে। তবে সাধারণ ক্রেতাদের এই নতুন সময়সূচির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য কিছুদিন সময়ের প্রয়োজন হতে পারে।
ব্যবসায়ী মালিক সমিতির এই সিদ্ধান্ত কেবল বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের একটি কৌশল নয়, বরং এটি একটি নাগরিক সংহতির বহিঃপ্রকাশ। যখন বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট এক ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে, তখন বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের এই দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রশংসাযোগ্য। তবে এই সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে মাঠ পর্যায়ের সঠিক তদারকি এবং সাধারণ মানুষের সহযোগিতার ওপর। যদি আমরা সবাই মিলে দিনের আলো থাকতে থাকতেই আমাদের কেনাকাটা ও বাণিজ্যিক কাজগুলো শেষ করতে পারি, তবেই এই মহৎ উদ্যোগ সফল হবে। এই ক্ষুদ্র ত্যাগের মাধ্যমেই কি আমরা বড় কোনো লোডশেডিং বা জ্বালানি বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে পারি না? বিষয়টি নিয়ে ভাবার সময় এখনই।