দেশের শিক্ষিত বেকার যুবকদের দীর্ঘদিনের দাবি ও প্রত্যাশা পূরণের লক্ষে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩২ বছর নির্ধারণ করে জাতীয় সংসদে বিল পাস হয়েছে। রোববার (৫ এপ্রিল) সংসদ অধিবেশনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বিলটি উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। এর ফলে দীর্ঘদিনের চলমান আলোচনা ও আন্দোলনের পর সরকারি কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো।
সংসদে পাস হওয়া ‘সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফাইন্যানসিয়াল কর্পোরেশনসহ (জনসাধারণের অ-আর্থিক সংস্থা) স্বশাসিত সংস্থাসমূহে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ বিল, ২০২৬’ অনুযায়ী, এখন থেকে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) সব ক্যাডার এবং বিসিএস বহির্ভূত সকল সরকারি চাকরিতে আবেদনের সর্বোচ্চ বয়সসীমা হবে ৩২ বছর। সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে যারা পড়াশোনা শেষ করে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তারা আগের চেয়ে দুই বছর বেশি সময় সুযোগ পাবেন।
বিলে উল্লেখ করা হয়েছে, যে সকল স্বায়ত্তশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থার নিয়োগ বিধিমালায় আবেদনের বয়সসীমা আগে ৩০ বা অনূর্ধ্ব ৩২ ছিল, সেই সব ক্ষেত্রেও এখন থেকে ৩২ বছর কার্যকর হবে। তবে এই আইনটি প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে যাতে কারও বিদ্যমান সুবিধা ক্ষুণ্ন না হয়। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো বিশেষায়িত পদের নিয়োগ বিধিমালায় আগে থেকেই বয়সসীমা ৩২ বছরের বেশি (যেমন ৩৫, ৪০ বা ৪৫ বছর) নির্ধারিত থাকে, তবে সেই উচ্চতর বয়সসীমাটিই বহাল থাকবে। অর্থাৎ, নতুন এই আইনের কারণে কারও সুযোগ কমবে না, বরং অনেকের জন্য সুযোগের পরিধি বাড়বে।
প্রতিরক্ষা কর্মবিভাগ (সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী) এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়োগের ক্ষেত্রে এই নতুন বয়সসীমা কার্যকর হবে না। এসব বাহিনী তাদের নিজস্ব বিদ্যমান নিয়োগ বিধিমালা ও শারীরিক যোগ্যতার মানদণ্ড অনুযায়ী নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাহিনীর বিশেষ প্রয়োজনে ও কর্মক্ষমতা বজায় রাখতে তাদের নিজস্ব নিয়মের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি।
বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী সংসদকে জানান, বর্তমান সরকার দেশের শিক্ষিত যুবসমাজকে দেশ গঠনে আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করতে চায়। শিক্ষিত বেকারদের মেধা ও শ্রমকে কাজে লাগিয়ে শ্রমবাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতেই এই বয়সসীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য যে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে জারিকৃত এ সংক্রান্ত দুটি পৃথক অধ্যাদেশকে স্থায়ী আইনি রূপ দিতেই এই নতুন বিলটি আনা হয়েছে।
সংসদীয় আলোচনায় আরও উঠে আসে যে, ইতিপূর্বে অধ্যাদেশ জারির পর কিছু কারিগরি জটিলতা দেখা দিয়েছিল। বিশেষ করে কিছু বিশেষায়িত বা কারিগরি পদে যেখানে অধিক অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয় এবং বয়সসীমা আগে থেকেই বেশি ছিল, সেখানে অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছিল। বর্তমান বিলের মাধ্যমে সেই সকল অস্পষ্টতা দূর করা হয়েছে। এখন থেকে ৩২ বছরের অধিক বয়সসীমা থাকা পদগুলোর বিদ্যমান নিয়ম সম্পূর্ণ নিরাপদ ও বহাল থাকবে।
বিলটি পাসের সময় অধিবেশনে উপস্থিত সদস্যরা টেবিল চাপড়ে এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে গিয়ে সেশনজট বা অন্যান্য কারণে অনেক শিক্ষার্থীর বয়স ৩০ পেরিয়ে যায়। এই আইনের ফলে তারা পুনরায় নতুন উদ্যমে সরকারি চাকরির প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারবেন।
সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩২ বছরে উন্নীত করা নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী এবং জনবান্ধব সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উচ্চশিক্ষা শেষ করতেই অনেক শিক্ষার্থীর বয়স ২৩ থেকে ২৫ বছর হয়ে যায়। এরপর প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেকের জন্য ৩০ বছর খুব সংক্ষিপ্ত সময় হিসেবে বিবেচিত হতো। তবে বয়স বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়োগ প্রক্রিয়ার গতি ত্বরান্বিত করা এবং নিয়মিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করাও জরুরি। কেবল বয়স বাড়ালেই বেকারত্ব সমস্যার সমাধান হবে না, বরং কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি এবং স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়াই পারে শিক্ষিত যুবকদের প্রকৃত মুক্তি দিতে। নতুন এই আইনটি কতটুকু কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থানে কতটুকু গতি আনে, তা-ই এখন দেখার বিষয়।